হযরত মুহাম্মদ (স) এর কৃতিত্ব ও সংস্কারসমূহ

 হযরত মুহাম্মদ (স) এর কৃতিত্ব ও সংস্কারসমূহ

ইসলামি জীবন বিধান কোনাে মানুষের চিন্তার ফল নয় তা স্বয়ং আল্লাহতালা প্রদত্ত ব্যবস্থা। এ জীবন ব্যবস্থার বিধি-বিধান মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স) ওহির মারফত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যে সকল কার্যকরী সংস্কার ও ব্যবস্থা মাধ্যমে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স) পতনােনুখ আরব জাতির মধ্যে জাগরণ আনয়ন করেন।


একটি ঘৃণিত ও অজ্ঞাত আরব জাতিকে সম্মানের উচ্চাসনে সমাসীন করেন। লুণ্ঠনকারী আরব জাতিকে অপরের সম্পদ হিফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বশীল করে গড়ে তােলেন। মদ্যপানে আসক্ত আরব জাতিকে মদ্যপানে নিরাসক্ত করে তােলেন।


জ্ঞানান্ধ ও মূর্খ আরব জনতাকে জ্ঞান-পিপাসু করে গড়ে তােলেন। আরবের মুশরিকদেরকে তৌহিদবাদীতে রূপান্তরিত করেন, দাস প্রথার বিলােপ সাধনে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং সভ্যতা বিবর্জিত আরব জাতিকে একটি উন্নয়নশীল সুসভ্য জাতিরূপে গড়ে তােলেন-সে সম্বন্ধে নিম্নে আলােচনা করা হলাে।


রাজনৈতিক সংস্কার

প্রাক-ইসলামি আরবে কোনাে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল না। এজন্য বিচ্ছিন্ন গােত্র সম্প্রদায়ে বিভক্ত আরববাসীদের মধ্যে কোন রাজনৈতিক ঐক্যবন্ধন গড়ে ওঠেনি। দেশে কোনাে বিধিবদ্ধ নিয়ম-কানুন ও শৃঙ্খলা না থাকায় অসংখ্য গােত্র ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত আরবদের মধ্যে কলহ-বিবাদ ছিল চিরাচরিত ঘটনা।


তাদের দস্যুবৃত্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে অশান্তি ও অনর্থের সৃষ্টি করে। মহানবি (স)  শতধা-বিভক্ত ও বিবদমান আরব জাতির গােত্র ভিত্তিক রাজনীতির অবসান ঘটান। তার প্রদত্ত মদিনা সনদ গােত্র প্রথার বিলােপ সাধন করে ইসলামি ভ্রাতৃত্ববােধের ভিত্তিতে একটি নতুন জাতি (উম্মাহ) প্রতিষ্ঠা করে।


গােত্র ব্যবস্থার অবসানে তিনি আরবদেরকে একই রাজনৈতিক ঐক্যবন্ধনে আবদ্ধ করে মদিনায় ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি আরবদেরকে একই রাজনৈতিক ঐক্যবন্ধনে আবদ্ধ করে মদিনায় ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেন।


নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে মহানবি (স) বিভিন্ন অমুসলিম গােত্রগুলিকেও একই রাজনৈতিক গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করেছিলেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার এ প্রচেষ্টা পরবর্তীকালের বৃহত্তর ইসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।


একমাত্র ধর্ম ও ঈমানের দ্বারাই তিনি মদিনার রাজনৈতিক অঙ্গনে শৃঙ্খলার পরিবেশ সৃষ্টি করেন। ফলে নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব পৌত্তলিকতার স্থান দখল করে নেয়। মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পর হযরত মুহাম্মদ (স) এই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামাে তৈরিতে মনােনিবেশ করেন।


শাসন ব্যবস্থায় তিনি ঐশীতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সমন্বয় সাধন করায় ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় কার্যাদি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হতে থাকে। বসওয়ার্থ যথার্থই বলেছেন, “যদি কেহ ঐশ্বরিক বিধান সম্মত শাসনবিধি প্রতিষ্ঠার গৌরব দাবি করতে পারেন, তবে তিনি মুহাম্মদ (স) ছাড়া আর কেউ নন।”


মদিনায় হিজরতের পর মহানবি (স) সেখানে সর্বপ্রথম একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ক্রমে এই মসজিদই ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বস্তুত এই মসজিদ ছিল মহানবি (স) এর প্রার্থনাগার, শিক্ষায়তন, সভাগৃহ, সরকারি কার্যালয় এবং গােত্রীয় প্রতিনিধি ও বৈদেশিক দূতদের সাথে মিলনের কেন্দ্র।


এখানেই বসে তিনি পবিত্র কুরআনের নির্দেশ, সাহাবীদের পরামর্শ ও স্বীয় বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। রাষ্ট্রাধিনায়ক হিসাবে মহানবি (স) এর কার্যকলাপ আগামী দিনের অনুকরণের দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করে।


শাসনকার্যের সুবিধার্থে হযরত মুহাম্মদ (স) সমগ্র আরব উপদ্বীপকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করেন। যেমন- মদিনা, খাইবার, মক্কা, তায়েফ, ইয়ামেন, সানা, হাযরামাউত, ওমান ও বাহরাইন। প্রদেশের শাসনকর্তার উপাধি ছিল ‘ওয়ালী’ ।


তিনি শুধু রাষ্ট্রনায়কই ছিলেন না, একাধারে তিনি ছিলেন ইমাম, প্রধান সেনাপতি ও বিচারক শাসন পদ্ধতির কেন্দ্রীয়করণের ফলে দেশে শান্তি ও সমৃদ্ধির শুভ সূচনা হয়।


সামাজিক সংস্কার

হযরত মুহাম্মদ (স) ছিলেন একজন যুগান্তকারী সমাজ সংস্কারক। তাঁর প্রবর্তিত সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব আরব সমাজে যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা বৈষম্যের প্রাচীর ভেঙ্গে ধুলিস্যাৎ করে দেয় তিনি একটি আধুনিক ও উন্নত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে এক অভূতপূর্ব বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেন।


আভিজাত্যের অহংকার ও বংশমর্যাদার দন্ড বিলােপ করে তিনি মানুষে মানুষে সকল অসাম্য ও ভেদাভেদের মূলােচ্ছেদ করেন। এরূপ সাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তিনি আরব সমাজ থেকে উচ্চ-নীচ, ধনী-দরিদ্র ও সাদা-কালাে পার্থক্য দূরীভূত করেন। 


নারীজাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সমাজ জীবনে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি হযরত মুহাম্মদ (স) এর সমাজ সংস্কারের একটি উল্লেখযােগ্য দিক। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত কোন ধর্মই নারীকে সমাজে তার প্রাপ্য মর্যাদা দান করেনি।


এতকাল তারা ভােগের সামগ্রীরূপে গণ্য হত। মহানবি (স) সমাজে নারী জাতির মর্যাদা প্রতিষ্ঠাকল্পে নিরলসভাবে কাজ করে যান। তিনি বলেন, “তােমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম ব্যবহার করে।


“মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত” এই বাণীর মাধ্যমে নারী জাতির প্রতি তার শ্রদ্ধাবােধের গভীরতা প্রকাশ পায়। তাঁরই প্রচেষ্টায় পুরুষের পবিত্র আমানত ও কল্যাণময়ীরূপে নারী সমাজের স্থান করেছে।


হযরত মুহাম্মদ (স) পারিবারিক ও বৈবাহিক আইন সংশােধন করে নারী জাতিকে ভােগের সামগ্রীর পরিবর্তে অর্ধাঙ্গিনী ও জীবনসঙ্গিনীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি তাদেরকে পিতা ও মৃত স্বামীর সম্পদে অধিকার এবং বিয়েতে সম্মতি প্রকাশের স্বাধীনতা প্রদান করেন।


আরব সমাজে কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর জীবন্ত প্রােথিত করার যে বর্বর রীতি প্রচলিত ছিল, তিনি তা চিরতরে রহিত করেন। মোট কথা, নারীর প্রতি শ্রদ্ধপ্রদর্শন ও তার মর্যাদা বৃদ্ধি মহানবি (স) এর প্রচারিত জীবন-দর্শনের এক অপরিহার্য অংশ ছিল।


হযরত মুহাম্মদ (স) আরবে তথা প্রায় সমগ্র বিশ্বে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত ক্রীতদাস প্রথার মূলে কুঠারাঘাত করেন। সত্য যে, সে সময়ের বিরাজমান পরিস্থিতির জন্য তিনি অবশ্য দাস প্রথার মূলােচ্ছেদ করতে পারেননি, তবে তিনিই তাদেরকে সর্বপ্রথম মানুষের মর্যাদায় উন্নীত করেন।


দাসদাসীর জীবন মরণ নির্ভর করত প্রভুদের মর্জি ও খেয়াল-খুশির উপর। ফলে মনিবগণ ক্রীত দাসদাসীদের প্রতি অমানুষিক অত্যাচার করত। তারা হাটে-বাজারে এবং যত্রতত্র পণ্যদ্রব্যের ন্যায় ক্রয়-বিক্রয় হত। মানুষ হিসেবে সমাজে তাদের কোনাে অধিকার ছিল না।


প্রভুর অনুমতি ব্যতিরেকে তাদের বিয়ে করা পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। মানুষের প্রতি মানুষের এরূপ নির্দয় আচরণে মহানবি (স) অত্যন্ত মর্মাহত হন। তাই তাদের মুক্তির পথ নির্দেশ করে তিনি ঘোষণা করেন, দাসদাসীদের মুক্তিদানের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর কাজ আল্লাহর নিকট আর কিছুই নেই।


বিদায় হজের ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে দাসদাসীদের প্রতি সদাচারণ ও উদার ব্যবহারের উপদেশ দেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি অনেক দাসদাসী ক্রয় করে মুক্ত করেন এবং অনেকে এই কাজে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন।


বহু দাসকে উচ্চ পদমর্যাদা দান করে তিনি আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।  তাদের প্রতি তাঁর সদাচরণ এবং তাদেরকে উচ্চ পদে নিয়ােগ ও সামাজিক মর্যাদা দানের ফলে ক্রমান্বয়ে দাস প্রথার বিলুপ্তির পথ সুগম হয়।


ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবদের নৈতিক জীবন বলতে কিছুই ছিল না। মহানবি (স) তাদের নৈতিক অবস্থার উন্নয়নের উদ্দেশ্যে হত্যা, মদ্যপান, জুয়াখেলা, সুদ খাওয়া, পরধনহরণ, রাহাজানি, ব্যভিচার, পুরুষের সংখ্যাতীত স্ত্রী গ্রহণ এবং স্ত্রীলােকের বহুবিবাহ প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘােষণা করেন।


এরূপে তিনি আরব সমাজ থেকে সর্বাধিক পাপাচার, অনাচার কুসংস্কার দূরীভূত করে এক যুগান্তরকারী ও সুদূরপ্রসারী বিপ্লব সাধন করেন।


ধর্মীয় সংস্কার 

ফন ক্রেমার বলেন, “নিকৃষ্ট ভক্তিযােগ্য বস্তুপূজা হতে কঠিন এবং অনমনীয় একেশ্বরবাদ ছিল ইসলামের ধর্মীয় সংস্কার” ।


পৌত্তলিকতা, ধর্মীয় কুসংস্কার, বস্তুপূজা প্রভৃতি যখন আরবের ধর্মীয় জীবনকে কলুষিত করেছিল, ঠিক সে সময় হযরত মুহাম্মদ (স) তৌহিদের বাণী নিয়ে আবির্ভূত হলেন।


একেশ্বরবাদের অমােঘ বাণী ঘােষিত হল- “আল্লাহ ছাড়া আর কোনাে উপাস্য নেই; হযরত মুহাম্মদ (স) তার প্রেরিত রসুল।”


একেশ্বরবাদের মূলমন্ত্রে রসুলুল্লাহ (স) সমগ্র ইসলাম জগৎকে একটি ভ্রাতৃসংঘে আবদ্ধ করেন। তিনি তাদেরকে যে ধর্মগ্রন্থ দেন তা সকল দেশের, সকল যুগের এবং সকল মানুষের জন্য একটি সুস্পষ্ট দিক দর্শন।


অধ্যাপক পি. কে. হিট্টির ভাষায়, “মুহম্মদ এমন একটি গ্রন্থের বিশ্বাসযােগ্য উপলক্ষ হয়েছেন, গােটা মানবজাতির এক-ষষ্ঠাংশ যে গ্রন্থটিকে সমস্ত বিজ্ঞান, জ্ঞান ও ধর্মতত্ত্বের মূর্ত প্রকাশ বলে আজও গণ্য করে। যথার্থ অর্থে ইসলামের বিজয় ধর্ম তথা তৌহিদেরই বিজয়। 


স্যাভারী সত্যই বলেছেন, বিশ্বের সকল ধর্ম প্রচারকগণের মধ্যে মুহাম্মদ (স.) সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্বের অধিকারী। জাররাষ্ট্রার ধর্মের দ্বিত্ববাদ, হিন্দুধর্মের ত্রিত্ববাদ (ব্রহ্ম, বিষ্ণু ও শিব) এবং খ্রিষ্টান ধর্মের ত্রিত্ববাদ-এর উপর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হল, আল্লাহ সম্বন্ধীয় ধারণার যথার্থ মর্যাদা দান এবং এর বিশুদ্ধীকরণ।”


ইপিকিউরাস বলেন, দেবতা-ভীতি হতে মুক্ত হতে না পারলে মানবজাতি কখনও স্বাধীন হতে পারে না। আরবের তথা বিশ্বের মানুষকে মুহাম্মদ (স) এই দেবতা-ভীতি হতে মুক্তি দান করেন।


ধর্মীয় অনুশাসন

হযরত মুহাম্মদ (স) মদিনায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসন প্রবর্তন করেন। প্রকাশ্যে নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে মুসল্লিদের আহ্বানের জন্য হযরত ওমর (রা) এর পরামর্শক্রমে কোন উচ্চস্থান হতে আযান দেয়ার ব্যবস্থা প্রচলিত হয়।


হযরত বিলাল (রা) ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন নিযুক্ত হন। নামাজের পূর্বে আযান ও ওযু এবং জামায়াতে নামাজ পড়ার প্রথা হিজরির প্রথম বছর অর্থাৎ ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে নির্ধারিত ও প্রচলিত হয়। 


মদিনার মসজিদে মুসলমানগণ সর্বপ্রথম জেরুজালেমের দিকে ফিরে নামাজ পড়তেন। কিন্তু হিজরির দ্বিতীয় বছর আল্লাহর ঐশীবানী লাভ করে হযরত মুহাম্মদ (স) জেরুজালেমের পরিবর্তে কা'বাকে ইসলামের কিবলা হিসেবে নির্ধারণ করলেন।


কুরআন শরীফে বলা হয়েছে, “হে মুহম্মদ! আমি আপনাকে উর্ধ্বে দৃষ্টিপাত করতে দেখেছি, সুতরাং অবশ্যই আমি আপনাকে ফিরিয়ে দেব সেই কিবলার দিকে যাতে আপনার সন্তুষ্টি রয়েছে। এখন আপন মুখ ফিরিয়ে নিন মসজিদে হারামের দিকে” (২ঃ১৪৪)।


আরনল্ড বলেন, “আপাত দৃষ্টিতে মনে না হলেও নামাজের মধ্যে কিবলা পরিবর্তনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এটাই ছিল ইসলামের জাতীয় জীবনের প্রথম পদক্ষেপ ও ইহা মক্কার কা'বাকে সমগ্র মুসলিম জাতির ধর্মীয় কেন্দ্রে পরিণত করে। কিবলা নির্ধারণ ছাড়াও ব্লেজা, ঈদ-উল ফিতর, ঈদ-উল-আযহা, যাকাত ও হজ পালনের প্রত্যাদেশ মহানবি (স) লাভ করেন।


অথনৈতিক সংস্কার

হযরত মুহাম্মদ (স) এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবে কোন সুষ্ঠু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল না। নগরবাসী ও স্থায়ীভাবে বসবাসকারী আরবগণ ব্যবসায়-বাণিজ্য ও কৃষিকার্য দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করত। তাদের আর্থিক অবস্থা মােটামুটি স্বচ্ছল ছিল।


কিন্তু মরুচারী বেদুইনগণ যাযাবর বৃত্তি ও লুণ্ঠন দ্বারা জীবিকার সংস্থান করত। তারা দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত ছিল। ঘৃণা কুসীদ প্রথা ও অন্যান্য শশাষণমূলক ব্যবস্থা চালু থাকায় দেশের সম্পদ মুষ্টিমেয় কতিপয় পুঁজিপতিদের হাত কুক্ষিগত হয়েছিল।


মহানবি (স) তাঁর অন্যান্য সংস্কারের ন্যায় সমতার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সংস্কার আনয়ন করেন। তিনি কুসীদ প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘােষণা করেন। দরিদ্র অভাবগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করার ও ধন সম্পদের সমবণ্টনের জন্য তিনি মুসলিম সমাজে যাকাত, সাদকাহ ও ফিতরা প্রবর্তন করে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার মূলে আঘাত হানেন।


রাষ্ট্রীয় আয়ের উৎস হিসেবে তিনি আল গাণিমাহ, যাকাত, জিজিয়া, খারাজ ও আল-ফাই-এর পরিমাণ নির্ধারণ করে দেন। বায়তুলমাল স্থাপন করে তিনি রাষ্ট্রের অর্থসম্পদে জনসাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত এবং দীন-দুঃখীদের সাহায্যের ব্যবস্থা করেন।


মহানবি (স) কায়িক পরিশ্রম, কৃষি ও বাণিজ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরােপ করে সদুপায়ে অর্থোপার্জনে উৎসাহ দিতেন। জুয়া খেলার মাধ্যমে অর্থ রােজগারকে তিনি নিষিদ্ধ করেন। এককথায়, তিনি আরবের সমগ্র অর্থনৈতিক জীবনকে নৈতিকতার গন্ডীতে আবদ্ধ করেন।


তিনি বলেছেন, সমাজে কারও স্থান অর্থসম্পদের মাপকাঠিতে নির্ধারিত হবে না, আল্লাহ ও তার রসুলের প্রতি বিশ্বস্ততার ভিত্তিতেই তার স্থান নির্ধারিত হবে। এভাবে দারিদ্র পীড়িত আরবদের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা সুষ্ঠু গতিপথ খুঁজে পায়। 


রাজস্ব ব্যবস্থা

হযরত মুহাম্মদ (স) এর জীবিতকালে নিম্নলিখিত উৎস হতে রাজস্ব আদায় করা হত-  (ক) আল-গাণিমাত (যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি), (খ) যাকাত, (গ) জিজিয়া, (ঘ) খারাজ (ভূমি রাজস্ব) এবং (ঙ) আলফাই (রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি)


১. গাণিমাত বা যুদ্ধ-লব্ধ দ্রব্যাদি

অস্ত্র-শস্ত্র এবং অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তিই যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদির অন্তর্ভুক্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু কর্তৃক পরিত্যক্ত এই সমস্ত অস্ত্র-শস্ত্র ও রসদপত্র অধিকার করে নেওয়া হত। যুদ্ধবন্দী কাফেরগণকে যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত করা হত।


উক্ত বন্দীদেরকে মুসলমান সৈন্যের দাস হিসেবে বিতরণ করা হত। যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যের চার-পঞ্চমাংশ যােদ্ধগণের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হত এবং অবশিষ্ট এক-পঞ্চমাংশ মহানবি (স) এর জন্য নির্ধারিত ছিল। এই অংশকে “খুমস” বলা হয়।


২. যাকাত

কুরআন শরীফে নামাজের পরেই যাকাত প্রদানের নির্দেশ রয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক সংগতিসম্পন্ন মুসলমানের একান্ত কর্তব্য দরিদ্রের মধ্যে বন্টন করার উদ্দেশ্যে যাকাত প্রদান করা। নিম্নলিখিত দ্রব্যাদি উপর যাকাত ধার্য করা হত। যথা

(ক) খাদ্য-শস্য, ফলমূলাদি ও খেজুর,

(খ) উট, ভেড়া, মেষ, ছাগল, গাে-মহিষ ইত্যাদি,

(গ) স্বর্ণ ও রৌপ্য এবং

(ঘ) বাণিজ্যিক দ্রব্যাদি ও নগদ অর্থ।

পূর্ণ এক বছরকালের জন্য সংসারের আবশ্যকীয় খরচাদি বাদ দিয়ে বাকি সম্পত্তির (নেসাব) উপর যাকাত ধার্য করা হয়। বিভিন্ন সম্পত্তির নেসাব বিভিন্ন রকম।


৩. জিজিয়া বা নিরাপত্তামূলক সামরিক কর

এই কর অমুসলমান প্রজাদের উপর ধার্য হতাে। এর পরিবর্তে তাদেরকে যুদ্ধে যােগদান হতে রেহাই দেওয়া হতাে এবং মুসলিম রাষ্ট্র তাদের জান-মালের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করত। অমুসলমানকে রক্ষা করতে না পারলে মুসলমানগণ তাদের প্রদত্ত জিজিয়া কর ফিরিয়ে দিত।


মহানবি (স.) এর জীবিতকালে প্রত্যেক সমর্থ অমুসলমান প্রজাকে বাৎসরিক এক দিনার হিসেবে জিজিয়া কর দিতে হত। জিজিয়া নতুন কর নয় তৎপূর্বে এই কর পারস্য ও রােমান সাম্রাজ্যে যথাক্রমে “গেজিট” এবং “ট্রাইবিউটম ক্যাপিটিস” নামে প্রচালত ছিল। আয়কৃত অর্থ সম্পূর্ণরূপে মুসলমান সৈন্যদের ব্যয়ভার নির্বাহের ক্ষেত্রে ব্যয়িত হত।


৪. খারাজ

অমুসলমান প্রজাগণকে নিজ নিজ ভূখণ্ডের উপর “খারাজ” নামক এক প্রকার ভূমি-রাজস্ব প্রদান করতে হতাে। উক্ত কর পারস্য ও রােমান সাম্রাজ্যের যথাক্রমে খারাগ’ ও ট্রাইবিউটম সলি' নামে পরিচিত ছিল। হযরত মুহাম্মদ (স) খারাজ ধার্য করেছিলেন উৎপন্ন শস্যের অর্ধেক।


৫. আলফাই

হানবি (স) এর শাসনাধীনে ‘আল-ফাই' নামক কিছু রাষ্ট্রীয় ভূমি ছিল। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হতে আদায়কৃত অর্থ সম্পূর্ণভাবে মুসলমান জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য ব্যয় করা হত।


সাংস্কৃতিক সংস্কার

আরববাসীরা কাব্যামােদী এবং কাব্য রচনা ও বর্ণনায় পারদর্শী হলেও তাদের রচনা বিষয়বস্তু অশ্লীল, শ্লেষপূর্ণ ও ব্যঙ্গাত্মক ছিল। আধুনিক যুগে শিক্ষা বলতে যা বুঝায়, তা আরবদের নিকট সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল।


শিক্ষাই জাতি মেরুদণ্ড তা উপলব্ধি করে হযরত মুহাম্মদ (স) জ্ঞানার্জনকে প্রত্যেকের জন্য বাধ্যতামূলক করেন।  মহানবি (স) এর উপর সর্বপ্রথম কুরআনের যে বাণী অবর্তীণ হয় তা হচ্ছে, পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে।


কুরআনের এ পবিত্র বাণীর উপর ভিত্তি করে তিনি জ্ঞানার্জনের বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ঘােষণা করেন-

১. শিক্ষিত লােকেরা নবিদের উত্তরাধিকারী। যারা শিক্ষার পথে বহির্গত হয়, তারা গৃহে না ফেরা পর্যন্ত আল্লাহর পথে থাকেন।

২. পন্ডিতদের কলমের কালি শহীদের শােণিতধারা অপেক্ষা অধিক পবিত্র।

৩. দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণ কর।

৪. এক মুহুর্তের জ্ঞান-চিন্তা সারা রজনীর উপাসনা অপেক্ষা শ্রেয় ইত্যাদি।


প্রশাসনিক সংস্কার

মদিনায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে রসুলে করীম (স) এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামাে সৃষ্টি করেন যার উপর ভিত্তি করে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে থাকে।


রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি যে ভূমিকা পালন করেন তা পরবর্তীকালের জন্য উদাহরণস্বরূপ। কুরআনের নির্দেশ, স্বীয় বিচারবুদ্ধি এবং ধার্মিক ও শিক্ষিত মুসলিম সমাজের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।


৬২২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিশ্বের সর্বপ্রথম মসজিদ মদিনায় স্থাপন করে সেখানে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় কার্য সমাধা করতেন। এ মসজিদই ছিল তাঁর বিদ্যালয়, প্রার্থনাগার, সরকারি দফতর, সভাগৃহ এবং বৈদেশিক দূত ও গােত্রীয় প্রতিনিধিদের সাথে মিলনের স্থান। 


শাসন ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য সমগ্র আরব দেশকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করা হয়; যেমন- খাইবার, তায়েফ, মক্কা, ইয়ামেন, তায়ামা, সানা, ওমান, হাজরামাউত ও বাহরাইন। প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে ‘ওয়ালি' বলা হত।


তিনি কেবল ইমামই ছিলেন না, প্রধান সেনাপতি, বিচারক এবং প্রশাসকের দায়িত্বও পালন করতেন। শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রীয়করণের ফলে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা দূরীভূত হয়।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন