মহানবী (সাঃ) এর হিজরত ও মদিনায় ইসলাম প্রচার

মহানবী (সাঃ) এর হিজরত ও মদিনায় ইসলাম প্রচার
মহানবী (সাঃ) এর হিজরত ও মদিনায় ইসলাম প্রচার

মদিনায় ইসলাম প্রচার

হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স) যখন কুরাইশদের নিকট ইসলাম প্রচার করে নিরাশ হলেন তখন তিনি আরবের অন্যান্য গােত্রের লােকদের মধ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। হজ্জের সময় আরবের বিভিন্ন গােত্র হতে মক্কায় হজ্জের উদ্দেশ্যে এবং বাণিজ্যের জন্যে যারা আসত তিনি তাদের কাছে গমন করে ইসলামের দাওয়াত দিতেন।

সে সময় মদিনায় আরবের দুটি বিখ্যাত গােত্র আউস ও খাজরাজ বসবাস করত। তাদের আদিবাস ছিল ইয়ামেনে। আউস ও খাজরাজ গােত্রের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছিল। আউস ও খাজরাজের গােত্রের লােকেরা শেষ নবির আগমনের কথা জানত এবং তাদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে তারা একজন নেতারও সন্ধান করতেছিল। তাঁরা মদিনার ইহুদিদের মাধ্যমে জানতে পেরেছিল যে, শেষ নবির আবির্ভাবের সময় সমাগত।

আকাবার প্রথম শপথ

নবুয়তের দশম বছরে হজ্জের মৌসুমে খাজরাজ গােত্রের কয়েকজন লােক মক্কায় এসে শুনতে পেল যে, এক ব্যক্তি নবুয়তের দাবি করছেন। মক্কা হতে একটু দূরে আকাবা নামক স্থানে ছয়জন লােক আলাপ-আলােচনা করতেছে। হযরত তাঁদের নিকট উপস্থিত হয়ে জানতে পারলেন যে, তাঁরা মদিনাবাসী খাজরাজ বংশীয় লােক।


হযরত তাদেরকে ইসলামের শিক্ষা ও সভ্যতার দিকে আহ্বান করলেন এবং কুরআন শরীফের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে তাঁদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করলেন। তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং মদিনায় পৌছে আল্লাহর মহত্ত্ব প্রচার করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেন।


এটিই ইসলামের ইতিহাসে আকাবার প্রথম শপথ অর্থাৎ বাইয়াত আল আকাবা  নামে পরিচিত। হযরত মুসআব (রা) নামক এক সাহাবিকে ধর্ম শিক্ষা দানের জন্য ইয়াসরিব তথা মদিনায় প্রেরণ করলেন। হযরত মুসআব (রা) ও নবদীক্ষিত মুসলমানদের প্রচেষ্টার ইয়াসরিবে ইসলাম ধর্মের প্রচার নতুন দিগন্তের সূচনা করে। ইয়াসরিববাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করে মূর্তিপূজা ত্যাগ করে।


আকাবার দ্বিতীয় শপথ

নবুয়তের একাদশ বছরে আউস ও খাজরাজ গােত্রের ১২ জন মদিনাবাসী পূর্ব কথিত আকাবা নামক স্থানে হযরতের সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলামের শপথ গ্রহণ করেন। স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করার সময় তাদের আবেদনে ধর্মীয় আহকাম শিক্ষা দেওয়ার জন্যে দু'জন প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। এটি আকাবার দ্বিতীয় শপথ নামে খ্যাত।


আকাবার তৃতীয় শপথ

নবুয়তের দ্বাদশ বছর আকাবার দ্বিতীয় শপথের পর সকলে মদিনায় ফিরে আসেন। সেখানে হযরত মুসআব (রা) ইমামতি করতেন। সে বছর হযরত মুসআব ও হযরত ওয়াইমের (রা) এর হাতে বহু লােক ইসলাম গ্রহণ করেন।


তাঁদের মধ্যে উসায়েদ ইবনে হােযায়ের এবং হযরত সাদ ইবনে খাইসাম (রা) ছিলেন। এ দুব্যাক্তির ইসলাম গ্রহণের ফলে অউস গােত্রের সকল নর-নারী মুসলমান হয়ে যান। এভাবে মদিনায় দ্রুতগতিতে ইসলাম প্রসার লাভ করতে থাকে।


ঐ বছর মদিনায় রসুলুল্লাহর সুখ্যাতি ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। তাদের মধ্যে থেকে ৭৩ জন নারী পুরুষ একসাথে হযরত (স) এর সাথে আকাবা নামক স্থানে শপথ গ্রহণ করেন। তারা প্রতিজ্ঞা করেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারাে উপাসনা করবেন না। তারা ইসলামের আদর্শ ও রীতি মেনে চলবেন ও তা রক্ষার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করবেন।


হযরতকে সর্ব প্রকার সাহায্য করতে দ্বিধা করবেন না। সেই রাতে কঠিন শপথের পর হযরত রসুল (স) ইসলাম প্রচার ও দ্বীনি তালিমের জন্যে তাদের মধ্য হতে বারজন নকীব বা প্রচারক নিযুক্ত করেন। ইসলামের ইতিহাস এটি আকাবার তৃতীয় শপথ নামে খ্যাত।


আকাবার শপথের মুল বিষয় 

হযরতের নিকট আকাবা নামক স্থানে মদিনাবাসীগণ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় করে যে প্রতিজ্ঞা করেন তা নিম্নে উদ্ধৃত করা হলঃ

১. আমরা এক আল্লাহর এবাদত-বন্দেগী করব, তাঁকে ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে ইলাহ বলে স্বীকার করব না এবং কাউকেও আল্লাহর সাথে শরিক করব না।

২. আমরা চুরি, ডাকাতি বা অন্য কোনাে প্রকারের অন্যায় কাজে লিপ্ত হব না।।

৩, আমরা ব্যাভিচারে লিপ্ত হব না।

৪. আমরা কোনাে অবস্থায় সন্তান হত্যা বা বলিদান করব না।

৫, আমরা কারাে প্রতি মিথ্যা দোষারােপ করব না।

৬. আমরা প্রত্যেক সঙ্কর্মে হযরতের অনুগত থাকব, কোনাে ন্যায় বিচারে অবাধ্য হবাে না।


হযরত মুহাম্মদ (স.) কে হত্যার ষড়যন্ত্র

মক্কার কুরাইশগণ যখন জানতে পারল যে, হযরত মুহাম্মদ (স) আকাবায়ে মদিনাবাসীদের সাথে গােপনীয়তার সাথে শপথ নিয়েছেন এবং তাদেরকে মদিনায় ফিরে গিয়ে ধর্ম প্রচার চালাতে নির্দেশ দিয়েছেন। কুরাইশদের শত অত্যাচার, নির্যাতন ও প্রলােভন সত্তেও যখন তারা হযরতকে ইসলাম প্রচার থেকে বিরত রাখতে পারে নি।


তদুপরি হযরত মুহাম্মদ (স) ইয়াসরিববাসীদের আমন্ত্রণে সেখানে চলে যাবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং ইয়াসরিবকে নিরাপদ আশ্রয় স্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তখন তারা তাকে হত্যা করার মনস্থ করে। এদিকে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু হলে তারা ছােট ছােট দলে বিভক্ত হয়ে ইয়াসরিবের দিকে যেতে থাকেন।


আবিসিনিয়া হতে প্রত্যাগত ২০০ জন মুসলমানকেও তিনি ইয়াসরিবে আশ্রয় গ্রহণ করতে বলেন। শুধু হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত আলী (রা.) রসুলুল্লাহ (স) এর সাথে মক্কায় অবস্থান করতে লাগলেন। হিংস্র কাফেররা আবু জাহলের নেতৃত্বে স্থির করে যে, প্রত্যেকে গােত্র থেকে এক এক জন যুবক নিয়ে হত্যাকারী দল গঠন করবে।


তারা একত্রে তরবারির আঘাতে হযরতকে হত্যা করবে। কুরাইশরা তাঁর গৃহ অবরােধ করলে আল্লাহর প্রত্যাদেশে হযরত (স.) আলী (রা) কে স্বীয় বিছানায় শায়িত করে হযরত আবু বকর (রা) কে সঙ্গে নিয়ে দুটি উটের পৃষ্ঠে আরােহণ করে তিনি ইয়াসরি অভিমুখে যাত্রা করলেন।


হযরতকে গৃহে না পেয়ে মুশরিকরা তাঁর পশ্চাদ্ভাবন করলে তিনি হযরত আবু বকরসহ পথিমধ্যে সওর নামক পর্বত গুহায় আত্মগােপন করে তথায় তিন দিন অবস্থান করেন। গুহায় অবস্থানকালে হযরত আবু বকর (রা)-এর পুত্র আবদুল্লাহ এবং কন্যা আসমা তাদের খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করতেন। চতুর্থ দিনে তাঁরা গিরিগুহা হতে বের হয়ে ইয়াসরিবের দিকে যাত্রা শুরু করলেন।


মক্কা থেকে ইয়াসরিবের দূরত্ব ২৫০ মাইল। পথে অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর (১২ রবিউল আউয়াল) তারিখে মদিনার নিকটবর্তী কুবা নামক স্থানে এসে পৌছেন। হযরত আলী (রা.) পরে তাদের সাথে যােগ দেন।


ইয়াসরিবে আগমন করে তিনি এর নাম পরিবর্তন করে মদিনাতুন্নবী বা নবির শহর রাখেন এবং এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মক্কা হতে মদিনায় হযরতের এ সুপরিকল্পিত প্রস্থানকে ইতিহাসে হিজরত বলা হয়।


মক্কা হতে মদিনায় আগমন ইসলামের ইতিহাসে একটি নব অধ্যায়ের সূচনা হয়। হযরতের এই হিজরতকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৭ বছর পর হযরত ওমর (রা) চন্দ্র বছরের প্রথম মাস মহররম এর প্রথম দিন (১৬ই জুলাই) হতে হিজরি সালের প্রবর্তন করেন। নিঃসন্দেহে ইসলামের ইতিহাসে এটি একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা।


হিজরতের কারণ

১. প্রাকৃতিক প্রভাব

মদিনা ছিল শস্য-শ্যামল ও উর্বর ভূমি। সেখানে স্বাস্থ্যকর ও সুশীতল আবহাওয়া বিরাজমান ছিল। তাই সেখানকার লােকদের আচার-আচরণ ছিল নম্র, ভদ্র ও মার্জিত। তারা ছিল দয়ালু ও পরােপকারী। তাই, সেখানে ইসলামের দাওয়াত সহজ ও গ্রহণীয় হবে ধারণা করে রসুল (স) মদিনায় হিজরত করেন।


২. ইসলাম প্রচারের অনুকূল পরিবেশ

আউস ও খাজরাজ গােত্রের লােকজন হজের মৌসুমে আকাবায় মিলিত হয়ে হযরতের নিকট শপথ করে ইসলাম গ্রহণ করলে মদিনায় ইসলামের বিস্তৃতি লাভ করে। এছাড়া, হযরত মুহাম্মদ (স) হযরত মুসআব (রা) কে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য মদিনায় প্রেরণ করেন।


এর ফলে দ্বিতীয় আকাবায় শপথ গ্রহণে কমপক্ষে ৭১ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলা হযরতের সথে মিলিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর মদিনায় ইসলাম ধর্ম প্রচারের অনুকূলে পরিবেশ সৃষ্টি হলে হযরত মুহাম্মদ (স) তথায় হিজরত করার ইচ্ছা পােষণ করেন।


৩. মনস্তাত্বিক কারণঃ

হযরত মুহাম্মদ (স) অতীতের নবি রাসুলদের ইতিহাস থেকে জানতে পেরেছেন যে কোন নবি-রসুলই নিষ্কন্টভাবে তাঁর জন্মভূমিতে দ্বীন প্রচারে সক্ষম হন নি। তদুপরি মক্কায় ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে জুলুমনির্যাতন সহ্য করা সত্ত্বেও ইসলামের পরিবেশ সেখানে কায়েম হয় নি। তাই তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন হিজরত করার জন্যে।


৪. আভিজাত্য ও কৌলীণ্যের প্রভাবঃ

ইসলাম সমতার ধর্ম। ইসলামের দৃষ্টিতে সকল মুসলমান ভাই ভাই। উচ্চ-নীচ কোন প্রভেদ নেই। কিন্তু মক্কার কুরাইশদের মধ্যে যে আভিজাত্য ও কৌলিন্য প্রথা মজ্জাগত ছিল তা ইসলামের প্রভাবে উলট-পালট হয়ে যেতে বাধ্য।


ঐতিহাসিক যশেফ হেল বলেনঃ মক্কার শাসকবর্গ ইসলাম ধর্মের শিক্ষার প্রতি যতখানি শত্রু ভাবাপন্ন ছিল, তার তুলনায় বেশি বিরুদ্ধ ভাবাপন্ন ছিল ইসলাম কর্তৃক আনিত সম্ভাব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রতি। ইসলামের শিক্ষা হল বংশ, জন্ম, আভিজাত্য বা পৌরহিত্যের জন্যে মানুষ কোন বিশেষ অধিকার লাভ করতে পারে না।


যে কারণে তারা ইসলামকে গ্রহণ করতে পারে নি। ইসলামের শিক্ষা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। ফলে তারা বিরােধীতার তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছিল।


৫. পুরােহিতদের বিরােধিতা

মক্কার পুরােহিতরা ছিল পৌত্তলিক। কাবাগৃহে তখন মূর্তি রাখা হয়েছিল এবং সেগুলাের পূজা হত। তাই, কাবা গৃহের একচ্ছত্র অধিকার ছিল মক্কার পুরােহিতদের। মূর্তিপূজার বিরােধী ইসলামের শিক্ষা হল আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনাে সত্ত্বার এবাদত করা যাবে না।


মক্কার পুরােহিতদের কায়েমি স্বার্থ-বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে তারা বিরােধিতা করতে থাকে। ফলে সেখানে ইসলামের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় হযরত মুহাম্মদ (স) মদিনায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন।


৬. ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত

মক্কার কুরাইশরা ধর্মান্ধ হয়ে পূর্ব-পুরুষদের চিরাচরিত আচার-অনুষ্ঠানকে আকড়িয়ে ধরে মূর্তিপূজা করত। তারা মূর্তিপূজাকে বর্জন করে তাওহিদের বাণীকে গ্রহণ করে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী হতে পারে নি।


তাওহীদ পরিপন্থী জড়বাদী ও মূর্তিপূজা ত্যাগ করার মানসিকতা তৈরি করতে পারে নি। তাই, তারা ইসলামের বিরােধিতা করার রসুল (স) মদিনায় হিজরত করেন।


৭. মুসলমানদের সংখ্যা স্বল্পতা

নবুয়ত প্রাপ্তির পর তিন বছর গােপনে ও ১০ বছর প্রকাশ্যে দাওয়াত দেয়া সত্বেও উল্লেখযােগ্য উন্নতি হয় নি। মানুষ মূর্তিপূজা ছেড়ে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে নি। আর যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদের উপরেও কুরাইশরা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের স্টীম রােলার চালিয়েছে।


ফলে মুসলমানগণ শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন নি কাফেরদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার। ইসলামের বিস্মৃতি, শক্তি বৃদ্ধি ও কাফিরদের প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য হযরত মদিনাকে বেছে নিয়ে হিজরত করেন।


৮. মদিনাবাসীদের দ্বন্দ নিরসন

মদিনায় যে সমস্ত লােক বসবাস করত তার মধ্যে খাযরাজ এবং আউস গােত্রদ্বয় প্রসিদ্ধ ছিল। তারা ইয়ামেন থেকে এখানে বসতি স্থাপন করে। অপরদিকে ইদি ধর্মাবলম্বী তিনটি গােত্রের লােকজনও এখানে বাস করত। তারা যথাক্রমে বনি কাইনুকা, বনি নাযির এবং বনি কুরাইযা। আউস এবং খাযরাজ গােত্রের লােকেরা দ্বন্দ্ব-কলহে লিপ্ত ছিল।


তাদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী এবং শান্তি স্থাপনের জন্য একজন মহাপুরুষের প্রয়ােজন তারা অনুভব করতে থাকে। অতপর হযরতের অসাধারণ ব্যক্তিত্বের সংবাদ পেয়ে তারা তাকে আমন্ত্রণ জানালেন। ফলশ্রুতিতে মহানবি (স) মদিনায় হিজরত করেন।


৯. প্রভাবশালী অভিভাবক ও জীবন সঙ্গিনীর অভাব

নবিজীর চাচা আবু তালিব সব সময় তাঁকে আশ্রয় দিয়ে রাখতেন। আর হযরত খাদিজা (রা) তাঁকে সব সময় পরামর্শ ও সাহস যােগাতেন। তাদের মৃত্যুতে তিনি অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়লেন। কুরাইশদের নির্যাতন আরও বহু গুণ বেড়ে গেল। এমনকি তার প্রাণ নাশের ব্যবস্থা পাকাপাকি করা হল। নবিজী জীবনের নিরাপত্তার অভাব বােধ করায় মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন।


১০. ইহুদিদের আমন্ত্রণ

মদিনার ইহুদিগণ তাওরাত কিতাবের মাধ্যমে জানতে পারল যে, শেষ নবির আবির্ভাব ঘটবে। তারা শেষ নবিকে মদিনায় তাদের মধ্যে পাবার একান্ত আগ্রহ প্রকাশ করল। হিজরতের পূর্বেই মদিনায় অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। মক্কায় কোনাে ইহুদি না থাকায় তারা শেষ নবির আবির্ভাবকে মেনে নিতে পারে নি। তাই তিনি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন।


১১. আত্মীয়তার সম্পর্ক

হযরত মুহাম্মদ (স) এর পিতা আবদুল্লাহ ও প্রপিতামহ হাশিম উভয়ে মদিনায় বিবাহ করেন। নবিজীর মাতা বিবি আমিনার দিক থেকে মদিনায় আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। তাছাড়া তার পিতা আবদুল্লাহর কবরও মদিনায় উপকণ্ঠে রয়েছে। সব দিক বিবেচনা করে নবিজীর মনে ধারণা জন্মে মদিনাবাসীদের সাহায্য ও সহযােগিতা তিনি লাভ করবেন। তাই তিনি মদিনায় হিজরত করেন।


১২. আল্লাহর নির্দেশ

ইসলামের উত্থানকে ঠেকানাের জন্যে মক্কার কাফির পৌত্তলিকগণ নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়েও কোন সুফল না পেয়ে আবু জাহেলের নেতৃত্বে দারুণ নাদওয়ায় পরামর্শ সভা ডেকে নবিজীকে হত্যা করার জন্যে হত্যাকারী কমিটি গঠন করে। তখন আল্লাহর প্রত্যাদেশের মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (স) কে নির্দেশ দেয়া হয় হিজরতের জন্যে। সে অনুসারে তিনি রাতের অন্ধকারে হযরত আবু বকর (রা) কে সাথে নিয়ে মক্কা ত্যাগ করেন।


হিজরতের গুরুত্ব

ইসলামের ইতিহাস ও মহানবি (স) এর জীবনে হিজরত এক গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূর প্রসারী ঘটনা। ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা ও ইসলামকে সার্বজনীন ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল হিজরতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। হিজরতের ফলাফল ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। নিম্নে হিজরতের ফলাফল ও গুরুত্ব আলােচনা করা হলােঃ


১. নির্যাতনের অবসান

হিজরতের ফলে হযরত মুহাম্মদ (স) এর জীবনে এক নব অধ্যায়ের সূচনা হয়। তাঁর মক্কা জীবনের লাঞ্ছনা, অবমাননা, ভয়-ভীতি দূর হয়। তিনি নির্বিঘ্নে ইসলাম প্রচারের সুযােগ লাভ করেন। মদিনায় সম্মান ও শ্রদ্ধার অধিকার হয়ে মদিনাবাসীদের আপনজন হিসেবে বিবেচিত হন। অপরদিক তার জীবনে নেমে আসা দুর্যোগের অবসান ঘটে। তিনি মক্কার পৌত্তলিকদের নির্যাতন, নিপীড়ন, জুলুম-অত্যাচার ও হতাশার দিনগুলাের অবসান ঘটিয়ে আশা ও আলাের পথ প্রাপ্ত হলেন।


২. সামাজিক ক্ষেত্র

হিজরতের ফলে মদিনায় সামাজিক ক্ষেত্রে এক বিপ্লব সাধিত হয়। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে নৈতিকতা ফিরে আসে, দুর্নীতি দূর হয়। খাজরাজ এবং আউস গােত্রদ্বয়ের মধ্যে দীর্ঘ দিনের ঝগড়া-বিবাদ, যুদ্ধ ও রক্তপাত বন্ধ হয় এবং সমাজে স্থায়ী শান্তি ফিরে আসে। নবিজী সমাজ থেকে সকল অনাচার-অবিচার দূর করে সমাজকে ইসলামি আদর্শে গড়ে তােলার সুযােগ লাভ করেন। সমাজে ইসলামি অনুশাসনের মাধ্যমে সমতা ফিরিয়ে আনেন।


৩.  ইসলামের উত্থান

হিজরতের ফলে ইসলাম অপ্রতিহত গতিতে প্রসার লাভ করতে থাকে। ইসলাম প্রচারে মহানবি (স) এর ওপর কোনাে বাধা অবশিষ্ট থাকে নি। ফলে ইসলাম একটি সার্বজনীন ধর্ম ও জীবন-ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। মক্কায় ইসলামের প্রসার ছিল খুবই মন্থর গতিতে এবং কন্টকাকীর্ণ, মক্কায় মুসলমানগণ ছিলেন সংখ্যালঘু। আর হিজরতের ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠদের ধর্মে পরিণত হয়। হযরত মুহাম্মদ (স) প্রকাশ্যভাবে দ্বীন প্রচার ও প্রসারের পরিকল্পনা ও সুযােগ লাভ করেন।


৪.  রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ

মদিনায় হিজরতের ফলে মহানবি (স) রাষ্ট্রপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি মদিনায় একটি কল্যাণধর্মী ইসলামী রাষ্ট্রের গােড়াপত্তন করেন। মক্কায় তিনি কেবল একজন ধর্ম প্রচারক ছিলেন। কিন্তু মদিনায় একাধারে রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসক ও কূটনীতিবিদ ছিলেন। মদিনার এই ক্ষুদ্র ইসলামি রাষ্ট্র পরবর্তী কালের বৃহত্তম ইসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তি ছিল ।


৫. ইসলামের আন্তর্জাতিক রূপ লাভ

হিজরতের পূর্বে মক্কায় ইসলাম ছিল গণ্ডীবদ্ধ বহু বাধার সম্মুখীন। আর মদিনায় হিজরতের ফলে ইসলাম আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে। ইসলামের বাণী দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। মহানবি (স) দূত প্রেরণের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে ইসলাম প্রচারের ব্যবস্থা করেন। ইয়ামান, রােম ও পারস্য দেশের শাসনকর্তাদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। ফলে ইসলাম আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করে।


৬. ইয়াসরিবের নতুন নামকরণ

মুহাম্মদ (স) ইয়াসরিবে হিজরত করার পর ইয়াসরিবের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মদিন্নাতুন নবি বা নবির শহর। হিজরতের পর থেকে ইয়াসরিবকে মদিনা নামে অভিহিত করা হয়। আর এ সময় থেকে হযরত ওমর (রা.) পরবর্তীতে হিজরি সালের প্রবর্তন করেন।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.