মহানবী (সাঃ) এর জন্ম ও মক্কা জীবন

মহানবী (সাঃ) এর জন্ম ও মক্কা জীবন
মহানবী (সাঃ) এর জন্ম ও মক্কা জীবন

মহানবী (সাঃ) এর
আবির্ভাব ও পরিচয়

সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ও সর্বশেষ নবি হযরত মুহাম্মদ (স)-এর আবির্ভাব কাল ছিল জাহেলিয়াতের যুগে। তখন আরব উপদ্বীপসহ সমগ্র পৃথিবী অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। সে সময়ে মিথ্যা, পাপাচার, হত্যা, লুণ্ঠন, মদ্যপান, জুয়া, যৌন অনাচার, কথায় কথায় ঝগড়া-বিবাদ এমনকি যুদ্ধ-বিগ্রহ পর্যন্ত ঘটে যেত।


কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তাদেরকে হত্যা করা হত জীবন্ত পুঁতে ফেলা হত। মানবতা বলতে যা বােঝায় তা ছিল তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। এক কথায়, মানুষ আল্লাহর বিধান এবং রসুলগণের আদর্শ ও সত্যের বাণী ভুলে গিয়ে পাশবিকতায় লিপ্ত ছিল্ মানবতার এ চরম দুর্দিনে আরবের মক্কা নগরে বিখ্যাত কুরাইশ বংশে আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মদ (স) কে পাঠালেন বিশ্ব মানবতার মুক্তি ও শান্তির দূত হিসেবে।


অংশীদারিতা, পৌত্তলিকতা ও জড় পূজা থেকে মানবজাতিকে একাত্মবাদের ও ন্যায়ের পথ প্রদর্শন করতে। বিশ্বের নির্যাতিত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষকে মুক্তি দিতে। মুক্তি ও শান্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (স)-এর মধ্যে ছিল সকল মানবিক গুণাবলির বিকাশ। তাই তিনি সমগ্র বিশ্বের মানুষের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পথ প্রদর্শক। তিনি ছিলেন মানব জাতির কল্যাণকারী।


হযরত মুহাম্মদ (স.) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। মাতৃগর্ভে থাকাকালীন তিনি পিতৃহারা হন। নবুয়ত লাভ পর্যন্ত ৪০ বছর এবং নবুয়ত লাভের পর থেকে মদিনায় হিজরত পর্যন্ত ১৩ বছর মােট ৫৩ বছর তিনি পবিত্র ভূমি মক্কায় কাটান।


এই সময়কালকে তাঁর মক্কা জীবন নামে আখ্যায়িত করা হয়। মদিনায় হিজরত করে মহানবি (স) মাত্র দশ বছর জীবিত ছিলেন এবং তিনি মদিনায় অবস্থান করেছিলেন। মদিনায় অবস্থানকালীন ১০ বছর কালকে সময়কে হযরতের মদিনা জীবন নামে আখ্যায়িত করা হয়।


হযরত মুহাম্মদ (স)-এর সমস্ত জীবনটাই ছিল সংগ্রামমুখর। নবুয়ত লাভের পর থেকে জাতির স্বার্থান্ধ ব্যাক্তিরা তাকে সহজে মেনে নেয়নি। নানা নির্যাতন, নিপীড়ন ও অত্যাচারে তারা হযরত

মুহাম্মদ (স)-এর জীবনকে বিষময় করে তুলেছিল।


তা সত্ত্বেও হযরত মুহাম্মদ (স) সফল হয়েছিলেন জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিস্ময়করভাবে। তার আদর্শিক বিপ্লবে উদ্ভাসিত হয় বিশ্ব মানবতা। আলােকিত হয় মানব ও মানব সভ্যতা। 


মহানবী (সাঃ) এর বংশ পরিচিতি

মুসলমান জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ) এর পুত্র ইসমাঈল (আ) এর বংশের উত্তর পুরুষগণ কুরাইশ নামে খ্যাত। হযরত ইসমাঈল (আ) এর বংশধর ফিহরের অপর নাম ছিল কুরাইশ। তাঁর নামানুসারে গােত্রের নাম রাখা হয় কুরাইশ।


তাঁর বংশধরগণ কুরাইশ নামে পরিচিত। কুরাইশ শব্দের অর্থ সওদাগর। তৎকালে আরবের মধ্য কুরাইশগণ ব্যবসায়-বাণিজ্যে অন্যান্য গােত্র থেকে উন্নতি সাধন করেছিল ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে মক্কায় তাদের ছিল একচ্ছত্র প্রাধান্য।


ফলে মক্কায় তাঁরা সম্মান ও প্রতিপত্তির অধিকারী হয়। ফিহর খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তাঁরই উত্তর পুরুষ কুশাই খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে মক্কা এবং হিজাযে প্রাধান্য বিস্তার করেন। তিনি কাবাগৃহের সংস্কার এবং তীর্থ যাত্রীদের সেবা-যত্ন করায় প্রসিদ্ধি লাভ করেন।


তিনি ধর্মীয় ও পার্থিব বিষয়ে আরবদের নেতা ছিলেন। ৪৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পুত্র আবদুন্দার মক্কার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন। আবদুদারের মৃত্যুর পর আব্দুল মানাফ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাঁর পুত্র আবদুদদারের পৌত্রগণ কাবা ঘরের রক্ষণাবেক্ষণ ও দারুণ নাদওয়া বা পরামর্শ সভাগৃহের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব লাভ করেন।


আব্দুস শামসের পর তাঁর ভাই হাশিম এবং তাঁর মৃত্যুর পর তার ভাই মুত্তালিব শাসনভার গ্রহণ করেন। মুত্তালিব বীরত্ব ও দানশীলতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন।


৫২০ খ্রিস্টাব্দে দয়ালু ও দানশীল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতুস্পুত্র শায়বাকে মক্কার সর্বময় কর্তৃত্ব পদান করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, শায়বাকে দয়ালু মুত্তালিবের ক্রীতদাস মনে করে তার নাম দেয়া হয় আবদুল মুত্তালিব। ইসলামের ইতিহাসে তিনিই আবদুল মুত্তালিব নামে পরিচিত।


তাঁর শাসনামলে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে আবিসিনিয়ায় বাদশাহ আবরাহা মক্কা নগরী আক্রমণ করে। আবরাহা হাতির পিঠে আরােহণ করে মক্কায় যুদ্ধ যাত্রা করেন বলে এ বছরকে হস্তিব বা আ-মুল ফিল’ (৬২। ) বলা হয়। মহান আল্লাহর নির্দেশে একদল আবাবিল পাখি ছােট ছােট পাথর কনা নিক্ষেপ করে আবরাহার বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়।


পবিত্র কুরআন শরীফের সূরা আল ফীলে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আবদুল মুত্তালিব অপরিসীম কার্যক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তিনি ৫৯ বছর বয়সে মক্কায় ক্ষমতাসীন থাকাকালে মৃত্যুবরণ করেন। আবদুল মুত্তালিবের সন্তানদের মধ্যে ১২ জন পুত্র এবং ৬ কন্যা সন্তান ছিল।


পুত্রগণের মধ্যে আবু তালেব, আব্বাস, হামজা এবং আবুদুল্লাহ ইসলামের ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। আব্বাস হলেন আব্বাসীয়া বংশের পূর্ব পুরুষ।  আবদুল মুত্তালিবের কনিষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহ ছিলেন বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (স)-এর পিতা। তিনি মদিনার বানু জোহরা গােত্রের নেতা আবদুল ওয়াহাবের কন্যা বিবি আমিনাকে বিয়ে করেন।


বিবাহের কিছুদিন পর আবদুল্লাহর ব্যবসায় উপলক্ষে সিরিয়া গমন করেন। কিন্তু বাণিজ্য থেকে ফেরার পথে মদিনায় উপকণ্ঠে অসুস্থ হয়ে মাত্র ২৫ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। বিবি আমিনা তখন গর্ভবতী ছিলেন। আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর হযরত মুহাম্মদ (স) জন্মগ্রহণ করেন।


হযরত মুহম্মদ (স)-এর জন্য ও প্রাথমিক জীবন 

আল্লাহর প্রেরিত সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বিশ্বনবি নিখিল বিশ্বের অনন্ত কল্যাণ ও আর্শীবাদের মূর্ত প্রতীক হযরত মুহাম্মদ (স) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট মােতাবেক ১২ রবিউল আউয়াল সােমবার আরবের মক্কা নগরে সম্রান্ত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম বিবি আমিনা।


হযরত মুহাম্মদ (স) এর উর্ধ্বতন একাদশ পুরুষের নাম ছিল ফিহর। তিনি কুরাইশ নামেও প্রসিদ্ধ ছিলেন। এ কারণে তার বংশধর কুরাইশী নামে খ্যাতি লাভ করে।


নামকরণঃ

হযরত মুহাম্মদ (স.) মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে তার পিতা আবদুল্লহ বাণিজ্য উপলক্ষে সিরিয়ায় গমন করেন। বাণিজ্য শেষে সিরিয়া থেকে ফেরার পথে মদিনার উপকণ্ঠে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। হযরতের দাদা ছিলেন আবদুল মুত্তালিব।


হযরতের জন্মের পর দাদা আবদুল মুত্তালিব নবজাত শিশুর লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং শিশুটির নাম রাখেন ‘মুহম্মদ' অর্থাৎ প্রশংসিত' | মাতা আমিনা তাকে আদর করে ডাকতেন ‘আহমদ' বলে। 


ধাত্রী গৃহে গমনঃ

মহানবি (স) জন্মের পর প্রথম সাত দিন নিজ মায়ের দুধ পান করেন। অতঃপর আরবের প্রথানুযায়ী শিশু মুহাম্মদ (স) কে লালন-পালনের জন্যে সাদ গােত্রের বিবি হালিমাকে ধাত্রী নিযুক্ত করা হয়। তিনি পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত বিবি হালিমার গৃহে লালিত-পালিত হন।


সেখানে অবস্থানকালে তৎকালীন আরব সমাজের মধ্যে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা আয়ত্ত করেন। 

প্রথম বক্ষ বিদীর্ণ বা সিনা চাকঃ বিবি হালিমার গৃহে লালিত-পালিত হওয়ার সময় হযরত মুহম্মদ (স)-এর বয়স যখন চার বছর মাত্র তখন দু’জন ফিরিশতা এসে তাঁর সিনা চাক করে নবুয়ত লাভের উপযােগী করে তােলেন এবং অন্তরের সমস্ত ব্যাধি দূর করে দেন। 


মাতৃক্রোড়ে বালক মুহাম্মদঃ

হযরত মুহাম্মদ (স)-এর বয়স যখন ছয় বছর তখন তিনি মাতা আমেনার কাছে ফিরে আসেন। তাঁর এ মাতৃ সান্নিধ্য বেশিদিন স্থায়ী হল না, তিনি মক্কা থেকে পিতা আবদুল্লাহর কবর যিয়ারত করার জন্য মায়ের সাথে মদিনায় গমন করেন।


মদিনা থেকে ফেরার পথে ‘আবওয়া' নামক স্থানে মাতা আমিনা অসুস্থ হয়ে সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় দাসী উম্মে আইমন তাঁকে মক্কায় নিয়ে এসে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের কাছে পৌছে দেন। আবদুল মুত্তালিবের কাছে মাত্র দু'বছর লালিত পালিত হন। পরে ৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি দাদাকেও হারান। 


চাচার অভিভাবকত্বে বালক মুহাম্মদঃ

দাদা আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর নবিজির লালন-পালনের দায়িত্ব পড়ে চাচা আবু তালিবের ওপর। চাচা আবু তালিব বালক মুহাম্মদ (স) কে যথাসাধ্য আদর-যত্নে প্রতিপালন করতে থাকেন। কিন্তু আবু তালিবের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল না থাকায় মুহাম্মদ (স) কে কঠোর পরিশ্রম করতে হতাে।


তাঁকে চাচার উট ও মেষ চরাতে হতাে এবং অবসর সময়ে তিনি মক্কায় তীর্থ যাত্রীদের পানি পান করাতেন। এ সকল কাজ-কর্মে নিয়ােজিত থাকা সত্ত্বেও তিনি অশ্ব চালনা, বর্শা চালনা, তলােয়ার চালনা প্রভৃতি শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১০ বছর বয়সে তাঁর দ্বিতীয় বার সিনা চাক হয়।

 

সিরিয়া গমনঃ

বার বছর বয়সে বালক মুহাম্মদ (স) চাচা আবু তালেবের সঙ্গে ৫৮২ খ্রিস্টাব্দে বাণিজ্য উপলক্ষে সিরিয়া গমন করেন। এ পরিভ্রমণে খােদাদ্রোহী সামুদ জাতির ধ্বংসাবশেষ অবলােকন ও প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্য দর্শনে তাঁর মন এক পরম সত্তার সান্নিধ্য পাবার আগ্রহ প্রকাশ করে।


কথিত আছে, সিরিয়া যাত্রাকালে পাদ্রী বুহাইরা বালক মুহাম্মদ (স) কে প্রতিশ্রুত শেষ নবি হিসেবে চিনতে পারেন। তিনি তার চাচাকে নবির ব্যাপারে ইহুদি খ্রিস্টানদের হতে সতর্ক করে দেন।


বালক মুহাম্মদ (স) প্রথমবারের মত জন্মভূমির বাইরে গমন করে বিশাল পৃথিবী এবং ব্যাপক কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে পরিচয় লাভ করেন। রসুল (স) ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে তিনবার সিরিয়া গমন করেছিলেন।


আল-আমীন উপাধি লাভঃ

বাল্যকাল থেকেই হযরত মুহাম্মদ (স) চিন্তাশীল ছিলেন। মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় তাঁর মন ব্যাথিত হত। তাঁর স্বভাব ছিল নরম-প্রকৃতির। তিনি সর্বদা সত্য কথা বলতেন, তাই তিনি সকলের শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তিনি কখনও অন্যায় আচরণ করতেন না।


এমনকি বাল্যকাল থেকেই লাত’ ও ‘উযযার নামে কোন বিশেষ কাজ করার কথা হয়ে তিনি বলতেন’ এ মূর্তিগুলাে দোহাই দিয়ে তােমরা আমাকে কিছুই বলাে না।


হযরত মুহাম্মদ (স)-এর কর্মনিষ্ঠা, সত্যবাদিতা, নম্রতা, আত্মবিশ্বাস প্রভৃতি গুণাবলির জন্য সকলে তাকে ভালােবাসত এবং ‘আল-আমীন' উপাধি দিয়েছিলেন। অবস্থা এমন হল যে, মুহাম্মদ নামটি চাপ পড়ে গেল। আল-আমীন নামটিই বেশি প্রসিদ্ধি লাভ করল। 


হারবুল ফুজারে অংশগ্রহণঃ

চাচা আবু তালিবের সঙ্গে সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরে আসার কিছুদিন পরেই শুরু হল বিখ্যাত মেলা। এ মেলায় জুয়া খেলা, ঘােড়াদৌড় ও কাব্য প্রতিযােগিতা নিয়ে শুরু হয় এক ভয়াবহ যুদ্ধ। এ যুদ্ধ “হারবুল ফুজ্জার” বা অন্যায় সমর বা পাপাচারীদের সমর নামে পরিচিত।


এ যুদ্ধ পাঁচ বছরকার স্থায়ী হয়েছিল এবং এতে অনেক লােকে প্রাণ হারিয়েছিল। যেহেতু এ যুদ্ধ কুরাইশ ও কায়েস বংশের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল, সেহেতু হযরত মুহাম্মদ (স)-কে তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে ঐ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হয়েছিল।


এ যুদ্ধে তিনি নিক্ষিপ্ত তীর সংগ্রহ করে চাচার হাতে তুলে দিতেন। কিন্তু তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি।


হিলফ-উল-ফুজুল

ফুজ্জার যুদ্ধে বীভৎসতা ও সহিংসতা দেখে তার মন অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পড়ল। তিনি আর্ত-পীড়িত, অসহায়, গরিব, দুর্বল ও অত্যাচারিতকে জালিম ও ধনীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে এবং আরবে শান্তি বজায় রাখার জন্যে কতিপয় শান্তিপ্রিয় যুবকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন ইতিহাসে এটি ' হিলফুল ফুযুল' বা শান্তি সংঘ’ নামে পরিচিত।


এ সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল

১. নিঃস্থ, অসহায় ও দুর্গতদের সেবা করা

২. অত্যাচারিতকে সাহায্য করা ও অত্যাচারীকে বাধা দেয়া

৩. শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা

৪. বিভিন্ন গােত্রের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন করা

৫. বিদেশি বণিকদের ধনসম্পদের নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা করা ইত্যাদি।


হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর বিবাহ

হিলফ-উল-ফুজুলের মাধ্যমে মানব কল্যাণকামী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি নিজকে এ সংঘের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করার সুবর্ণ সুযােগ লাভ করলেন। সকলের কাছে।


সরলতা, সততা, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক গুণাবলির কথা আলােচিত ও প্রশংসিত হতে লাগল। এ সুনাম কুরাইশ বংশের এক বিধবা নারী বিবি খাদিজার কাছেও পৌছল। বিবি খাদিজা বিপুল ধন-সম্পদের মালিক ছিলেন।


অপরদিকে ৰূপে, গুণে ও বংশের মর্যাদায় তিনি হিজাজের মধ্যে অদ্বিতীয়া ছিলেন। চরিত্রের পবিত্রতা ও স্বাভাবিক শুদ্ধাচারের জন্যে বিবি খাদিজা আরব দেশে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিলেন। এজন্য মক্কাবাসীরা তাকে ‘খাদিজাতুত তাহিরা বা নিষ্কলঙ্ক খাদিজা নামে অভিহিত করেছিল।


বিবি খাদিজা হযরত মুহাম্মদ (স) কে প্রথমে তাঁর ব্যবসায়-বাণিজ্যের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন এবং ক্রমশ তাঁর চরিত্র মাধুর্য, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। তিনি তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন।


আবু তালিবের অনুমতি নিয়ে হযরত মুহাম্মদ (স) খাদিজাকে স্ত্রী হিসেবে বরণ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর এবং বিবি খাদিজার বয়স ছিল ৪০ বছর। হযরত মুহাম্মদ (স) দীর্ঘ ২৫ বছর কাল বিবি খাদিজার সাথে সংসার ধর্ম পালন করেন এবং খাদিজার জীবদ্দশায় তিনি অন্য কোনাে স্ত্রী গ্রহণ করেন নি।


খাদিজার গর্ভে হযরতের তিন পুত্র হযরত কাসেম, আবদুল্লাহ তৈয়ব ও তাহের এবং চার কন্যা হযরত ফাতেমা, রােকাইয়া, কুলসুম এবং যয়নাবের জন্ম হয়েছিল। তিন পুত্র শৈশবেই মারা যান কিন্তু কন্যাগণ জীবিত ছিলেন।


রােকাইয়া এবং কুলসুমের সাথে হযরত উসমান (রা)-এর বিবাহ হয় সেজন্য হযরত উসমানকে যুননুরাইন বা দু’জ্যোতির অধিকারী বলা হয়। সর্ব কনিষ্ঠা মেয়ে ফাতিমার সাথে হযরত আলী (রা)-এর বিবাহ হয়। আবু তালিবের অসচ্ছলতার জন্যে হযরত আলী মুহাম্মদ (স) এর গৃহে লালিত-পালিত হন।


বিবি খাদিজার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ায় হযরত মুহাম্মদ (স) জীবনধারণের সংগ্রামে অবতীর্ণ হন নি। স্ত্রী। বিত্তশালী হওয়ায় ভবিষ্যত কর্মপন্থা নির্ধারণে, স্থি চিত্তে, সূক্ষ্মভাবে চিন্তার অবকাশ ও সুযােগ ঘটে। হযরত্রে নবুয়ত্রে বিকাশ ও সার্থকতার জন্য বিবি খাদিজার সহযােগিতার প্রয়ােজন ছিল।


হাজরে আসওয়াদ স্থাপন

মক্কার কাবাঘর পৃথিবীব্যাপী চির প্রসিদ্ধ। এর নাম বাইতুল্লাহ (su :)। এ গৃহটি হযরত ইবরাহীম (আ) এর সময় হতেই বিশ্বের সর্বপ্রধান এবাদত খানা রূপে পরিগণিত ছিল। মানুষ আল্লাহকে ভুলে গিয়ে অন্ধ-কুসংস্কারের মােহ পড়ে এই পবিত্র গৃহে বহু দেব-দেবীর মূর্তি স্থাপন করা সত্ত্বেও একে আল্লাহর ঘর হিসেবে বিশ্বাস করত।


কাবা গৃহটি সংস্কারের প্রয়ােজন দেখা দিলে কুরাইশ বংশের সকল গােত্র একত্রিত হয়ে নতুন করে কাবাগৃহ নিমার্ণ করতে সংকল্পবদ্ধ হয়। তারা সকলে মিলে। কাবা গৃহের নির্মাণ কার্য সমাপ্ত করেন। কিন্তু হাজরে আসওয়াদ বা কাল পাথরটি কে যথাস্থানে স্থাপন করবেন তা নিয়ে মহা বাক-বির্তঙের সৃষ্টি হয়।


পাথরটির সাথে সামাজিক মর্যাদা ও বংশগত প্রাধান্যের বিষয় সম্পৃক্ত ছিল। প্রত্যেক গােত্রের লােকই দাবি করতে লাগল যে, তারাই পাথরটি স্থাপনের একমাত্র অধিকারী। প্রথমে বচসা, অতঃপর তুমুল দ্বন্দ্ৰ কলহ শুরু হল। এভাবে চারদিন অতিবাহিত হয়ে গেল কিন্তু মীমাংসার কোন লক্ষণই দেখা গেল না।


তখন আরবের চিরাচরিত প্রথানুসারে সকলে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেল। যুদ্ধ যখন একেবারে অনিবার্য হয়ে পড়ল, তখন জ্ঞানবৃদ্ধ আবু উমাইয়া সকলকে আহবান করে বললেন, স্থির হও, স্থির হও, আমার কথা শােন। বৃদ্ধে গভীর মর্ম বেদনাপূর্ণ গম্ভীর আহবানে সকলে ফিরে দাঁড়াল।


তখন তিনি সকলকে বুঝিয়ে বললেন এবং প্রস্তাব দিলেনঃ “যে ব্যাক্তি আগামীকাল সর্বপ্রথম কাবা গৃহে প্রবেশ করবে তিনিই এ বিবাদের ফয়সালা দেবেন। তিনি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন সকলেই তা মেনে নেবে।” এ প্রস্তাবে সকলেই সম্মত হল। প্রথম আগন্তুক আগমনের প্রতীক্ষায় সকলেই উদগ্রীব রইলেন এবং কাবা ঘরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। 


এমন সময় শতকণ্ঠে আনন্দ পােল উঠল এইত আমাদের ‘আল-আমীন উপস্থিত। আমরা সকলেই তার মীমাংসায় সম্মত। হযরত তখন তাদের মুখ থেকে সকল ঘটনা শুনলেন এবং নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তিনি তার সমাধান দিলেন।


তিনি একখানা চাদর বিছিয়ে নিজে পাথরটি এর মধ্যস্থলে স্থাপন করেন এবং বিদ্যমান সকল গােত্রের প্রতিনিধিগণকে বললেন এবার আপনারা প্রত্যেকেই এর চাদরের এক এক প্রান্ত ধরে পাথরটিকে যথাস্থানে নিয়ে আসুন। সকলেই তা করলেন। তখন হযরত মুহাম্মদ (স) পুনরায় পাথরটি নিজ হাতে তুলে যথাস্থানে বসালেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৫ বছর।


1 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
নবীনতর পূর্বতন