মহানবীর মদিনা জীবন, মদিনার অধিবাসী ও মদিনা সনদ

মহানবীর মদিনা জীবন, মদিনার অধিবাসী ও মদিনা সনদ
মহানবীর মদিনা জীবন, মদিনার অধিবাসী ও মদিনা সনদ

মদিনার অধিবাসী ও মদিনা সনদ

হযরত মুহাম্মদ (স) এর মদিনায় আগমনের পূর্বে মদিনার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শশাচনীয় ছিল। মদিনায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার মত কোন কেন্দ্রীয় সরকার ছিল না। এ সময় আউস ও খাযরাজ নামে মদিনার দুটি গােত্র পরস্পর হিংসাত্মক কলহ-বিবাদে লিপ্ত ছিল। মদিনায় বসবাসরত ইহুদিগণ তখন তিনটি শাখায় বিভক্ত ছিল (১) বানু কাইনুকা (২) বানু নাজির ও (৩) বানু কুরাইযা। তাদের স্বার্থপরতা ও চক্রান্তের ফলে মদিনার অন্যান্য অধিবাসী উদ্বেগ ও সংশয়ের মধ্যে দিনাতিপাত করত। এরূপ অবস্থায় হযরত মুহাম্মদ (স) এর মদিনায় আগমনকে মদিনাবাসী আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়। হযরত মুহাম্মদ (স) এর নেতৃত্বে তারা সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন জীবন লাভ করে। বিশৃঙ্খলা ও অশান্তির পরিবর্তে মদিনায়

শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।


প্রাথমিক কার্যাবলি

হযরত মুহাম্মদ (স) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা হতে মদিনায় হিজরত করলে ইসলামের ইতিহাসে এক

যুগসন্ধিক্ষণের সূচনা হয়। তিনি মদিনায় মসজিদ-আল-নবি নামে ইসলামের প্রথম মসজিদ স্থাপন করেন। এর নির্মাণ কাজে তিনি অন্যান্য মুসলমানদের সাথে কাজ করেন। এখানে তিনি ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যাবলি সম্পাদন করতেন এবং সপরিবারে বসবাস করতেন। 


মহানবি (স) মক্কা থেকে হিজরতকারী মুসলমানদের ‘মুহাজিরিন এবং আশ্রয় দানকারী মদিনায় মুসলমানদের “আনসার” অর্থ সাহায্যকারীরূপে অভিহিত করেন। মদিনায় তখন পাঁচ শ্রেণির অধিবাসী ছিল। যথা মুহাজেরিন, আনসার, ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুশরিক। এ সময় স্বার্থ হাসিলেন জন্য অনেক ইসলাম গ্রহণ করলেও মনেপ্রাণে তারা হযরত মুহাম্মদ (স) কে গ্রহণ করতে পারেনি। সংকটময় মুহূর্তে তারা তার বিরােধিতা করত। সেজন্য তাদের মুনাফিক (বহুবচনে মুনাফিকিন) বলা হত। মদিনা জীবনের প্রাথমিক অবস্থায় হযরত মুহাম্মদ (স) তাদের কারণে অনেক বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং তিনি অত্যন্ত কৌশলে তাদের মােকাবিলা করেন। এ দলের নেতা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবনু সালুল।


মদিনার সনদ ও ইসলামি রাষ্ট্র গঠন

সনদের প্রয়ােজনীয়তা

মহানবি (স) মক্কা হতে ইয়াসরিবে হিযরত করার পর এমন কতােগুলাে সমস্যার সম্মুখীন হন যার জরুরি সমাধান অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রথমত মক্কার কুরাইশ মুহাজির এবং স্থানীয় ইয়াসরিববাসী আনসারদের মধ্যকার অধিকার ও কর্তব্যের সীমারেখা টানা, দ্বিতীয়ত মুহাজির বাসস্থান ও জীবিকার সংস্থান করা, তৃতীয়ত কুরাঈশদের হাতে ক্ষতিগ্রস্থ মুহাজির ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা, চতুর্থতঃ মদিনার অমুসলমান বিশেষত ইহুদিদের সাথে একটি সমঝােতায় পৌছা, পঞ্চমতঃ মদিনা নগরীর রাজনৈতিক সংগঠন এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা, ষষ্টতঃ মদিনার সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় রূপরেখা প্রণয়ন করে মদিনাবাসীদের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আইনগত কাঠামাে গঠন করা এবং সর্বোপরি ইসলাম ধর্মের

প্রচার এবং মুসলমানদের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার তাগিদে মুসলিম ও অমুসলিম প্রত্যেকের দায়িত্ব, কর্তব্য এবং অধিকার নিশ্চিতকরণ। এ সমস্ত সমস্যার সমাধানকল্পে নবি করিম (স) ইয়সরিবের পৌত্তলিক, ইহুদি, আনসার ও মুহাজিরদের জন্য যে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করেন তা হল কিতাব আর রসুল বা সহিফা রসুল সংক্ষেপে মদিনার শাসনতন্ত্র বা মদিনার সনদ।


প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহম্মদ ইবনে ইসহাক (মৃত্যু ৭৬৭ খ্রিঃ) এর সিরাত-ই-রসুলুল্লাহ হতে এই সংবিধান পূর্ণ অবয়বে বিদ্যমান থাকলেও দুর্ভাগ্যবশত এই গ্রন্থখানা এখন আর পাওয়া যায় না। তবে ইবনে ইসহাকের লেখা জীবনচরিত ইবনে হিশামের (মৃত্যু ৮৩৪ খ্রিঃ) পরবর্তীকালীন সমালােচনামূলক সংশােধনীতে বিদ্যমান রয়েছে। ঐতিহাসিক আবু ওবায়েদও এটিকে সংরক্ষিত করার চেষ্টা করেছেন। এ সনদে ৫৩ টি ধারা রয়েছে।


সনদের মুখবন্ধ

মুহম্মাদুর রসুলুল্লাহ (স) কুরাইশ ইয়াসরিবের মু'মিন এবং যারা পরবর্তীকালে তাঁদের অনুসরণ করবে ও তাঁদের সাথে সংযুক্ত থেকে এবং এক সাথে জিহাদ করবে তাদের এটি একটি লিখিত কিতাব। সনদের গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহঃ

১. সনদের শরীক দলের সকলে অন্যান্য লােকদের থেকে স্বতন্ত্র একটি উম্মাহ বা জাতি।

২. এই সহিফায় অঙ্গীকারাবদ্ধ লােকদের জন্য ইয়াসরিব উপত্যাকা পবিত্র।

৩. ইয়াসরিবকে অতর্কিত হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তারা একে অপরকে সাহায্য করবে।

৪. যে সকল ইহুদি আমাদের অনুসারী হবে তারা আমাদের সাহায্য ও সহানুভূতি পাবে। এ সম্পর্ক ততদিন বর্তমান থাকবে যতদিন তারা মুসলমানদের ক্ষতি করবে না।

৫. ইহুদি সম্প্রদায়ের মিত্ৰগণও সমান স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা ভােগ করবে।

৬. যুদ্ধের সময় ইহুদিগণ মুসলমানদের সঙ্গে সমভাবে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করবে।

৭. কোন মুমিন একজন মুশরিকের জন্য একজন মুমিনকে হত্যা করবে না বা কোন মুশরিক মুমিনের বিরুদ্ধে সাহায্য করবে না।

৮. কেউ কুরাইশদের বা অন্য কোন বহিঃশত্রুদের সাথে মদিনাবাসী বিরুদ্ধে কোনরূপ ষড়যন্ত্র করতে পারবে না।

৯. কোন ব্যক্তি অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর জন্য তার সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবে না।

১০. মুসলমান ও অমুসলমান সকলে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে।

১১. মহানবি (স) এর অনুমতি ছাড়া মদিনার কোন সম্প্রদায় কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করতে পারবে না।

১২. এই সনদের লোকদের মধ্যে কোনাে বিষয়ে মতবিরােধ দেখা দিলে তা মীমাংসার জন্য আল্লাহ এবং আল্লাহর রসুল মুহাম্মদ (স) এর উপর ন্যস্ত করতে হবে।

১৩. আশ্রিত ব্যক্তি আশ্রয়দানকারীর মতই, যততক্ষণ পর্যন্ত যেকোনো অন্যায় বা বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।

১৪, এই সহিফায় যা আছে আল্লাহ তার সত্যতার সাক্ষী এবং রক্ষাকারী।

১৫. আল্লাহ সৎ ও ধর্মভীরুদের রক্ষাকারী এবং মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর রসুল।


সনদের গুরুত্ব

প্রথম লিখিত সংবিধান

মদিনা সনদ পৃথিবীর ইতিহাসে সর্ব প্রথম লিখিত সংবিধান। ইতােপূর্বে শাসকের ঘােষিত আদেশেই ছিল আইন। মহানবি (স) সর্ব প্রথম জনগনের মঙ্গলার্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রীয় শাসনে দেশের সকল সম্প্রদায় ও জনগণের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সহযােগিতার প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করে তিনি এই সনদ প্রণয়নের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। বস্তুত মদিনার সনদে নাগরিক সাম্যের মহান নীতি, আইনের শাসন, ধর্মের স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতা, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ঘােষিত হওয়ায় এই সনদকে মহাসনদ বলা হয়।


রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়

মদিনা সনদ মুসলমান ও অমুসলমান সম্প্রদায়কে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করে হিংসা, দ্বেষ ও কলহের অবসান ঘটায়। বিপদে একে অপরকে সাহায্য করার জন্য তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। মদিনা রাষ্ট্র তথা ইসলামি প্রজাতন্ত্র

সংরক্ষণে সকলের সমভাবে যুদ্ধ ব্যয় বহন করার ব্যবস্থা, হযরত মুহাম্মদ (স)-এর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচায়ক।


সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববােধ প্রতিষ্ঠা

 মদিনা সনদ গােত্র প্রথার বিলােপ সাধন করে ইসলামি ভ্রাতৃত্ববােধের ভিত্তিতে হযরত মুহাম্মদ (স)-এর উপর রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মীয় অনুশাসন পরিচালনার দায়িত্ব অপর্ণ করে। অধ্যাপক পি, কে, হিট্রি বলেন, মদিনা প্রজাতন্ত্রই পরবর্তীকালে বৃহত্তম ইসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল স্থাপন করেন।


ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা

 মদিনা সনদ মুসলমান ও অমুসলমানদের ধর্মে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিশ্চয়তা বিধান করে। মদিনার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লােকেরা একে অপরের ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। হযরত মুহাম্মদ (স) এ শর্ত দ্বারা যে মহানুভবতা ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দেন তা বিশ্বের ইতিহাসে সত্যিই বিরল। সর্বগুণান্বিত, সর্বশ্রেষ্ঠ যুগান্তকারী এ মহাপুরুষ তৎকালীণ বিশ্বে ধর্ম ও রাজনৈতিক সমন্বয়ে যে ইসলামী উম্মাহ বা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন, উত্তরকালে ইহা বিশাল ইসলামী সাম্রাজ্য স্থাপনে সহায়তা করে।


মদিনার পুনর্গঠন ও মহানবি (স) এর শ্রেষ্ঠত্ব

 মদিনা সনদের মাধ্যমে মহানবি (স) দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত আরব জাহানকে একতাবদ্ধ করার একটি মহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত মদিনা নগরীর পুনর্গঠনের প্রয়াস পান। উপরন্তু এই সনদে হযরত মুহাম্মদ (স) তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, কুটনৈতিক দূরদর্শিতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বিকাশের মাধ্যমে বিশ্বের সর্বযুগের

সর্বশ্রেষ্ঠ যুগান্তকারী মহাপুরুষরূপে আবির্ভূত হন।


ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা

মদিনা সনদের শর্তসমূহ হতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম সমাজের চরম কর্তৃত্ব আরব গােত্রীয়

প্রধানদের নিকট হতে হযরত মুহাম্মদ (স) এর এবং তদূৰ্ব্বে আল্লাহতাআলার উপর ন্যস্ত হয়েছে। এই সনদ আল্লাহর সর্বময় প্রভুত্বের ধারণা প্রচারিত করে। এ যাবৎ আরবদের নিকট তা একেবারেই অজ্ঞাত ছিল। মুসলিম সমাজের জনসাধারণকে তাদের গােত্রীয় স্বাধীনতার একটি বিশেষ অংশ পরিহার করে ঐশী নির্দেশের নিকট আনুগত্য স্বীকার করতে হয়েছিল। সুতরাং মুসলিম রাষ্ট্র ও সমাজ তখন ঐশীতন্ত্রে পরিণত হল। ফলে আলাহতায়ালা প্রদত্ত বিধানের আলােকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনীয় দায়িত্ব নবি হযরত মুহাম্মদ (স.) এর উপর পূর্ণাঙ্গ ভাবে ন্যত হলাে প্রকৃত প্রস্তাবে ধর্ম, রাষ্ট্রের মধ্যে কোনাে পার্থক্য বর্তমান থাকল না। নবজাত মুসলিম রাষ্ট্র ইসলাম ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রে পরিণত হল। বস্তুতপক্ষে, মদিনা সনদের কতােগুলাে ধারা হতে প্রতীয়মান

হয় যে, মদিনা রাষ্ট্র ছিল একটি সাধারণতন্ত্র। সে রাষ্ট্রে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের নাগরিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার স্বীকৃত ছিল। এ রাষ্ট্রে সকর গােত্রের যােগদানের সুযােগ উমুখ ছিল। আল্লাহর জিম্মা এবং মহানবির নিরাপত্তা তাদের প্রদান করা হত। সে রাষ্ট্রে ব্যক্তি স্বাধীনতা, ধর্মীয় অধিকার, সামাজিক মূল্যবােধ, গণতান্ত্রিক মর্যাদাবােধ, আল্লাহর একত্ব ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস এবং নবি ও রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (স)-এর নেতৃত্ব স্বীকৃত ছিল। এ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামাের যে ধাচ মুহাম্মদ (স) তৈরি করেছিলেন এর উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে খলিফাগণ যুগােপযােগী সংযােজন নীতিমালা সংযােজন করে অধিকতর কল্যাণকর প্রশাসন কাঠামাে গড়ে তুলতে সক্ষম হন।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন