ঐতিহাসিক প্রাচীন সভ্যতা

 প্রাচীন সভ্যতা

মানব সভ্যতার ইতিহাস উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করেছে। সভ্যতার ইতিহাস কখন থেকে শুরু হয়েছিল একথা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও সভ্যতার গতি স্থির থাকেনি। ঐতিহাসিক আরনল্ড টয়েনবি পৃথিবীর ইতিহাসকে বিভিন্ন কৃষ্টির ক্রমবিকাশের ফল বলে আখ্যায়িত করেছেন। একথা সত্য যে, আধুনিক সভ্যতাসহ পূর্ববর্তী প্রতিটি সভ্যতা তার পূর্বের সভ্যতার কাছে ঋণী।


পূর্ববর্তী সভ্যতার আর্থ-সামাজিক প্রভাব পরবর্তী প্রতিটি সভ্যতার উপর ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। সভ্যতার উন্মেষের মূল প্রধান কারণগুলাে ছিল ক্রমবর্ধমান মানব সমাজের সামাজিকীকরণ, লােকসংখ্যা বৃদ্ধি, বিভিন্ন ধরনের সমাজ উন্নয়নমূলক কার্যকলাপ। যেমনঃ কৃষিকার্য, সেচ ব্যবস্থা, যানবাহনের উন্নতি, রাষ্ট্রীয় বিধান ও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রবর্তন, শিল্প, স্থাপত্য, শিক্ষা ও বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা প্রভৃতি। ইউফ্রেটিস, টাইগ্রীস, নীল ও সিন্ধুনদের অববাহিকায় পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলাে বিদ্যমান রয়েছে।


বলা বাহুল্য যে, মিসরীয় সভ্যতা ও মেসােপটেমীয় সভ্যতা মানব জাতীর সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন পুরাতন সভ্যতা বলে প্রমাণিত। সুমেরীয় সভ্যতা, কালদীয় সভ্যতা, ব্যাবিলনীয় সভ্যতাসহ আরো কিছু প্রাচীন সভ্যতার সমন্বয়েই মেসােপটেমীয় সভ্যতার প্রকাশ হয়েছিল।


মিসরীয় সভ্যতা

প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতা পৃথিবী ইতিহাসের সুসমৃদ্ধ সভ্যতা। এ সভ্যতার উন্মেষ হয় মিসরের নীলনদের অববাহিকায়। সভ্যতার ইতিহাসে মিসরীয়গণ যে অবদান রেখেছেন সম্ভবত অপর কোনাে জাতি এরূপ অবদান রাখতে সক্ষম হয় নি।


প্রাচীন মিসরই ছিল বিশ্বের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অগ্রদূত। মিসরের ভৌগােলিক অবস্থানমিসরকে নীলনদের দান বলা হয়। কারণ মরুভূমিতে পরিণত হওয়া মিসর নীলনদের প্রভাবেই জুন হতে অক্টোবর মাসের মধ্যে উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়।


এ সময়ের মধ্যে নীলনদের উভয় তীর প্লাবিত হয়। প্লাবন শেষে পলিমাটিতে উভয় তীর দৈর্ঘ্যে ৬০০ মাইল এবং প্রস্থে ১০ মাইল পর্যন্ত ভরে যায়। এরূপ সঞ্চিত পলিমটির গুণে উভয় ভূভাগ অত্যন্ত উর্বর হয়। ফলে শস্য, তুলা প্রভৃতি প্রচুর পরিমানে উৎপন্ন হওয়ায় মিসর একটি সমৃদ্ধিশালী দেশে পরিণত হয়।


এশিয়া, ইউরােপ ও আফ্রিকা এ তিনটি মহাদেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকায় এবং ভূ-মধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থানের জন্য মিসরের ভৌগােলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।


মেসােপটেমীয় সভ্যতা

মিসরীয় সভ্যতায় সমসাময়িককালে ইরাক অঞ্চলের টাইগ্রীস (দজলা) এবং ইউফ্রেটিস (ফোরাত নদীর মধ্যবর্তী ভূমিতে সময়ের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি নগর সভ্যতার উন্মেষ ঘটে। একত্রে এ সভ্যতাসমূহকে “মেসােপটেমীয় সভ্যতা” বলে।


মেসােপটেমীয় সভ্যতার মধ্যে রয়েছে সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, অ্যাসিরীয়, আক্কাদীয় ও কালদীয় সভ্যতা। মিসরীয় সভ্যতার সঙ্গে মেসােপটেমীয় সভ্যতার পার্থক্য এই যে, প্রথমটি ছিল নীতি -ধর্মভিত্তিক এবং দ্বিতীয়টি আইনশাস্ত্রভিত্তিক।


সুমেরীয় সভ্যতা

সুমেরীয় সভ্যতা ছিল মেসােপটেমীয় সভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা। এ সভ্যতার ধারক বাহক ছিল অসেমেটিক সুমেরীয়গণ। তাঁদের নামানুসারে তাদের সভ্যতাকে “সুমেরীয় সভ্যতা” বলা হয়।


তাঁরা ছিল মূলত টাইগ্রীস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যস্থিত অববাহিকা অঞ্চলের অধিবাসী। তারা লিখন পদ্ধতি, আইন-কানুন, ধর্মীয় অনুভূতি, ব্যবসায়-বাণিজ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা প্রথম শুরু করে।


ব্যাবিলনীয় সভ্যতা

টাইগ্রীস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল “মেসােপটেমীয়া” নামে পরিচিত। মেসােপটেমীয়ার দক্ষিণে ব্যাবিলনীয় সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল। সুমেরীয় রাজা ডুঙ্গীর মৃত্যুর পর সুমেরীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের উদ্ভব ঘটে।


ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে সেমেটিক জাতির যে শাখাটি টাইগ্রীস ও ইউফ্রেটিস নদীর উপত্যকায় গমন করে স্থায়িভাবে বসতি স্থাপন করে কালক্রমে তারা অ-সেমেটিক সুমেরীয় জাতির সমন্বয়ে ব্যাবিলনীয় সভ্যতা গড়ে তােলে। 


বিশ সভ্যতায় ব্যাবিলনীয়দের অবদান

ব্যাবিলনীয় সভ্যতা ছিল নিঃসন্দেহে উন্নত সভ্যতা। আধুনিক সভ্যতা প্রাচীনকালে ব্যাবিলনীয় সভ্যতার কাছে বিশেষভাবে ঋণী। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া এমনকি গ্রিকগণও সভ্যতার বিকাশের ক্ষেত্রে ব্যাবিলনীয়দের কাছে ঋণী।


জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের অবদান পরবর্তী শতাব্দীগুলাের অনুসন্ধিৎসু পন্ডিতদের গবেষণা পরিচালনা করার পথ রচনা করে গেছে। তারা নিজস্ব ও অন্যান্য জাতির পৌরাণিক কাহিনী কিংবা লৌকিক উপাখ্যান সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করে হিব্রু বাইবেলের পটভূমি রচনা করে গেছেন।


তারা সমলােচনামূলক ও বিস্তৃতভাবে পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করে অংকশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূতত্ত্ববিদ্যা, ইতিহাস, চিকিৎসাবিদ্যা, ব্যাকরণ, দর্শন এবং অভিধান সংকলনের ভিত্তি রচনা করে গেছেন। তাঁরা মহাকাব্য, ধর্মীয় গীতি প্রবাদ ইত্যাদিরও প্রবর্তক ছিলেন।


সভ্যতার ক্ষেত্রে তাদের এ সমস্ত কর্মকান্ড ক্রমে ক্রমে নিকট প্রাচ্য এবং ইউরােপে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্ব সভ্যতার অগ্রগতিতে উল্লেখযােগ্য অবদান রেখেছে।


হিব্রু সভ্যতা

প্রাচ্য এবং প্রতীচ্যের প্রাচীনতম সভ্যতাসমূহের মধ্যে হিব্রু সভ্যতা একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। হিব্রুগণ সেমেটিক জাতির একটি উল্লেখযােগ্য শাখা। তারা ছিল যাবাবর শ্রেনির লােক। আরবদেশ থেকে প্রথমে তারা প্যালেস্টাইন গমন করেন।


তাদের আদিপুরুষ হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর নেতৃত্বে মেসােপটেমীয়ায় বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে সিরিয়া ও প্যালেস্টাইনে তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কালক্রমে তারা ফিনিসীয়, আরামীয় ও হিবু- এ তিন ভাগে বিভক্ত হয়। 


পারসিক (সাসানীয়) সভ্যতা

 ইসলাম ধর্মের প্রবর্তনের প্রাক্কালে সাসানীয়া ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য মধ্য প্রাচ্য ও নিকট প্রাচ্যে খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের পূর্বে আর্যদের যে শাখাটি পারস্য উপসাগরের দক্ষিণে বসতি গড়ে তােলে, তারা পারসিক এবং যে শাখাটি উত্তর-পশ্চিমের পর্বত সংকুল এলাকায় বসতি স্থাপন করে, তারা মেদ নামে পরিচিত ছিল।


সম্রাট সাইরাসের অধীনে তারা খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ অব্দে কালদিয়া সাম্রাজ্য দখল করে নেয়। সাইরাসের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ক্যামবিসাস সিংহাসনে আরােহণের পর খ্রিষ্টপূর্ব ৫২৫ অব্দে মিসর জয় করেন। ক্যামবিসাসের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যে কিছুকাল অরাজকতার পর খ্রিষ্টপূর্ব ৫২১ অব্দে ডেরিয়াস (দারায়ুস) সিংহাসনে বসে।


অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে তিনি রাজ্য বিস্তারে মনােনিবেশ করেন। তিনি ছিলেন পারসিক সম্রাটদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট। তাঁর সাম্রাজ্য পূর্বে ভারতের সিন্ধু নদের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাঁর শাসনামলে সম্রাট আলেকজেন্ডার ফারাসি সাম্রাজ্য সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে।পরবর্তীতে তাঁর উত্তরাধিকারীর সম্রাট জারজেসের শাসন আমলে আলেকজেন্ডার ফারাসি সাম্রাজ্য দখল করেন।


গ্রিক সভ্যতা

ইউরােপের দক্ষিণে অবস্থিত আড্রিয়াটিক, ভূ-মধ্যসাগর ও এজিয়ান সাগর পরিবেষ্টিত এবং অসংখ্য দ্বীপাঞ্চল সম্বলিত গ্রীস ছিল প্রাচীন সভ্যতার পীঠস্থান। গ্রীসের এ ভৌগােলিক অবস্থা প্রাচীন গ্রীসে গড়ে উঠা সভ্যতাকে অন্যসব প্রাচীন সভ্যতা থেকে আলাদা করেছে।


গ্রিকবাসী তাদের দেশকে ‘হেলাস’ বলত এবং তারা যে সভ্যতা গড়ে তােলে তা ‘হেলেনিক সভ্যতা' নামে পরিচিত। আলেকজেন্ডার, সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো, হিরােডােটাস, পিথাগােরাস, আর্কিমিডিস, ইউক্লিড প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তি গ্রীসে জন্ম গ্রহণ করেন।


শিক্ষা ও সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গ্রিকদের অবদান অবিস্মরণীয়। বিশ্বজগৎ যখন সভ্যতার দিকে হাঁটি হাঁটি কছিল, গ্রিক জাতি তখন জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়ে চারদিক আলােকিত করছিল। প্রয়ােজনীয় প্রতিটি ক্ষেত্রে গ্রীস তার কৃতিত্ব সংযােজন করে। তাই বিশ্বসভ্যতা গ্রিকদের কাছে বহু দিক দিযে ঋণী। 


রােমান সভ্যতা

বিশ্ব সভ্যতায় রােমানদের অবদান অপরিসীম। সভ্যতার ইতিহাসে গ্রিকদের পরেই রােমানদের নাম স্মরণীয়। রােমানদের অবদানগুলাে প্রধানত দু'ভাগে বিভক্ত। এক গ্রিকদের জ্ঞানভান্ডারকে তারা সজীব রাখেন। দুই- নতুন উপাদান দ্বারা বিশ্ব সভ্যতাকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যান ।


রােমান সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল প্রাচীন রােম নগরীকে কেন্দ্র করে। বর্তমানে ইতালির পশ্চিম-দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরের উপকূলে রােম নগরী অবস্থিত ছিল। রােম নগরী সাতটি টিলার উপর ছড়িয়ে ছিল। এজন্য রােমকে সাতটি, পর্বতের নগরী' নামেও অভিহিত করা হয়।


ঐতিহাসিক প্রাচীন সভ্যতা
 ঐতিহাসিক প্রাচীন সভ্যতা


ঐতিহাসিক লিভি বলেন, লােকশ্রুতি অনুসারে নির্বাসিত দুই রাজাপুত্র রােমুলাস ও রেমাস সিংহাসন পুনরাধিকার করে ৭৫৩ খ্রিস্টপূর্ব রােম নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। রােমুলাসের নামানুসারে রােম নগরী নামকরণ করা হয়।


সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকা, দক্ষিণ ইউরােপ, আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলের সীমানা এবং নিকট প্রাচ্যের একটি বিরাট অংশ নিয়ে রােমান সাম্রাজ্য গঠিত হয়। সম্রাট কনস্টানটাইন গােটা রােমান সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা বজার রাখেন। তার পরেও ৩৯৫ খ্রিস্টপূর্ব এ অখণ্ডতা অক্ষুন্ন থাকে।


অতঃপর থিওডােসিয়াস এবং তাঁর পুত্রের শাসনামলে সাম্রাজ্যের অখন্ডতা বিনষ্ট হয় এবং পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যে রােমান সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যায়। কনস্টানটাইন হতে শুরু করে একমাত্র সম্রাট জুলিয়ান ব্যতীত অন্যান্য সকল সম্রাটই খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন।


সম্রাট হিরাক্লিয়াসের শাসনামল অবধি রােমানদের রাষ্ট্রভাষা ছিল ল্যাটিন। তৎপর সেদেশে গ্রিক ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় থিওডােরাসের পর প্রথম জাসটিনিয়ন রােমান সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন।


রােমান সাম্রাজ্যের বিস্তার এবং রােমান আইনের সংকলন ও প্রকাশনা ছিল তার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি। ঐতিহাসিক মায়ার্স বলেন, “এ আইন বিশ্বের নিকট রােমান প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ সম্পদ”। পরবর্তী প্রসিদ্ধ রােমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস মহানবি (স) কর্তৃক প্রেরিত দূতকে সসম্মানে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। রােমান সম্রাটদের মধ্যে অগাস্টাস ছিলেন আর একজন উল্লেখযোেগ্য সম্রাট।


রােমান সাম্রাজ্য পতনের প্রধান কারণ ছিল সম্রাটদের দ্বন্দ্ব, বিদ্বেষ। মাত্রাতিরিক্ত বিলাসিতা ও দাসপ্রথা রােমের পতনকে তরান্বিত করে। রােম সাম্রাজ্যের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন স্বয়ং সম্রাট।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.