সিরিয়া যুদ্ধের ঘটনা ও রােমানদের সাথে যুদ্ধের কারণ

সিরিয়া যুদ্ধের ঘটনা ও রােমানদের সাথে যুদ্ধের কারণ
সিরিয়া যুদ্ধের ঘটনা ও রােমানদের সাথে যুদ্ধের কারণ

দামেক বিজয়

খলিফা হযরত আবু বকর (রা) এর খিলাফতকালে সিরিয়ায় একটি সুপরিকল্পিত যুদ্ধাভিযান প্রেরণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৬৩৪ খ্রিঃ আজনাদাইনের যুদ্ধে মুসলমানদের নিকট শশাচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে রােমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস এন্টিওকে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং সেখান থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য একটি নতুন সৈন্যবাহিনী সংঘটিত করেন। মহাবীর হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) দ্রুত আজনাদাইন হতে দামেস্ক রওয়ানা হন। দামেস্ক ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সিরিয়া প্রদেশের রাজধানী বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবেও এ নগরীর যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সুদৃঢ় ছিল। হযরত খালিদ (রা) প্রায় ৬ মাস দামেস্ক অবরােধ করে রাখলে নগরীর অধীবাসীরা হতােদম হয়ে পড়ে। সম্রাট হিরাক্লিয়াস আপ্রাণ চেষ্টা করেও এই অবস্থার কোনাে উন্নতি বিধান করতে পারেননি। অবশেষে হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) একদল দুঃসাহসী মুসলিম যােদ্ধর সাহায্যে রাতের অন্ধকারে প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং দ্বাররক্ষীদের হত্যা করে দামেস্ক নগরী মুসলমানদের নিকট উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। ৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসে দামেস্ক সম্পূর্ণভাবে মুসলমানদের করতলগত হয়। এই বিজয় হযরত আবু ওবায়দা (রা), হযরত আমর ইবন আল আস (রা) ও হযরত সুরাহবিল(রা) সেনাপতি হযরত খালিদকে বিশেষভাবে সাহায্য করেন।


ফিহলের যুদ্ধ

দামেস্ক বিজয়ের পর মুসলমানগণ জর্দান অভিমুখে অগ্রসর হলে সম্রাট হিরাক্লিয়াস এন্টিওক থেকে ৫০,০০০ সৈন্যের এক বাহিনী দামেক পুনরুদ্ধারের উদ্দেশে প্রেরণ করেন। কিন্তু হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদের সতর্কতার ফরে তারা দামেকে প্রবেশ করত অসমর্থ হয়ে জর্দানে অবস্থান করতে থাকে। মুসলিম বাহিনী “ফিহল” নামক স্থানে তাবু স্থাপন করেন। মুসলমানদের দৃঢ়সংকল্প ও মনােবল দেখে রােমানগণ বিচলিত হয়ে ওঠে। তারা মুসলমানদের সাথে সন্ধির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু রােমানদের অযৌক্তিক প্রস্তাব সম্বলিত সন্ধির শর্ত মুসলমানগণ প্রত্যাখ্যান করলে ফিহলে উভয়পক্ষের এক তুমুল যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। যুদ্ধে রােমানগণ পরাজিত হয়। মুসলমানগণ রােমানদের জীবন, সম্পত্তি ও গির্জার হেফাজতের নিশ্চয়তা দেন। উল্লেখ্য যে, উইলিয়ম মূইরের বর্ণনা মতে দামেস্ক বিজয়ের পূর্বে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। 


হিমস অধিকার 

জর্দান অধিকার করার পরে মুসলিম বাহিনী সিরিয়ার বিখ্যাত ও প্রাচীন নগরী হিমসের দিকে অগ্রসর হয়। সামান্য বাধার সম্মুখীন হওয়ার পর মুসলমানগণ প্রচণ্ডভাবে হিমস আক্রমণ করলে নগরীর অধিবাসীগণ আত্মসমর্পণ করে। হিমস অধিকৃত হলে খলিফা হযরত ওমর (রা) মুসলিম সেনাপতিদেরকে আর সম্মুখে অগ্রসর হতে না দিয়ে বিজিত অঞ্চলের শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন করার নির্দেশ দেন তিনি হযরত আবু ওবায়দাকে হিমসের হযরত আমর ইবন আল আসকে জর্দানের এবং হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদকে দামেস্কের দায়িত্ব অর্পণ করেন।


ইয়ারমুকের যুদ্ধ

দামেস্ক, জর্দান ও হিমসের ন্যায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শহরের পতনে রােমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে আর্মেনীয়, সিরীয় রােমীয়ও আরব গােত্রীয় খ্রিস্টানদের নিয়ে গঠিত ২,৪০,০০০ সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী ভ্রাতা থিওড়ােরাসের নেতৃত্বে প্রেরণ করেন। অপরপক্ষে মাত্র ৩৫,০০০ সৈন্যের এক মুসলিম বাহিনী হযরত আবু ওবায়দার অধিনায়কত্বে ইয়ারমুকের প্রান্তরে শিবির স্থাপন করে। হযরত আমর ইবর আল আস (রা) ও হযরত খালিদ-বিন ওয়ালিদ (রা) তার সাথে মিলিত হন। ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে ইয়ারমুকে এক সর্বাত্মক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে রােমীয়দের শােচনীয় পরাজয় ঘটে এবং ঐতিহাসিক বালাজুরীর মতে ইয়ারমুকের যুদ্ধে সত্তর হাজার এবং ঐতিহাসিক তাবারীর মতে এক লক্ষের অধিক রােমান সৈন্য নিহত অথবা আহত হয়। মুসলমানদের পক্ষে তিন হাজার সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন। রােমানদের বিপর্যয়ের সংবাদে সম্রাট হিরাক্লিয়াস কনস্টান্টিনােপলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।


ইয়ারমুকের যুদ্ধের গুরুত্ব

ইয়ারমুকের যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী যুদ্ধ। কাদেসিয়ার যুদ্ধ যেমন চিরকালের জন্য পারস্যের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়, ইয়ারমুকের যুদ্ধ ঠিক তেমনি সিরিয়ার ভাগ্য নির্ধারকের ভূমিকা পালন করে। এ যুদ্ধের পর সমৃদ্ধিশালী সিরিয়া চিরদিনের জন্য রােমান সাম্রাজ্যের হস্তচ্যুত হয়। ইয়ারমুকের যুদ্ধ রােমানদের মনােবল সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে দেয়। তাদের প্রতিরােধ ক্ষমতা বিনিষ্ট হয়ে পড়ে তারা বিভিন্ন শর্তে মুসলমানদের সাথে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ যুদ্ধের সাফল্য মুসলমানদের পরবর্তী বিজয়ের পথ প্রশস্ত ও সুগম করে। 


সেনাপতি হযরত খালিদের পদচ্যুতি ও সমগ্র সিরিয়া বিজয়

ইয়ারমুকের যুদ্ধের অব্যবহিত পর খলিফা হযরত ওমর (রা) হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদকে ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেন এবং তদস্থলে হযরত আমর (রা) কে নিযুক্ত করেন। তিনি সিরিয়ার শাসনকর্তা খলিফার প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে উত্তর সিরিয়ার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। তিনি হযরত সুরাহবিলকে জর্দান, হযরত ইয়াজিদকে লেবানন এবং হযরত আমর ইবন আল আসকে প্যালেস্টাইন ও জেরুজালেম অভিমুখে প্রেরণ করে তিনি দ্রুতগতিতে বালবেক, এডেসা, এন্টিওক, আলেপ্পো কিক্সিসিরিন প্রভৃতি স্থান দখল করে সমগ্র সিরিয়া অঞ্চলে মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।


জাজিরা 

রােমানদের সাথে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে রােমান সম্রাটের শত্রুতার অবসান ঘটেনি। ৬৩৮ খ্রিঃ রােমান সম্রাটের প্ররােচনায় ৩০ হাজার জাজিরাবাসী বিদ্রোহ ঘােষণা করে মুসলিম আধিপত্য খর্ব করার চেষ্টা করে। অতঃপর নিরাপত্তা বিধানের জন্য হযরত আবু ওবায়দা (রা) অভিযান পরিচালনা করে ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে জাজিরা দখল করেন। আর্মেনিয়া ও সাইলিসিয়া দখল ও রোমানদের প্ররােচনায় কুর্দ ও আর্মেনিয়ানরাও আরব শাসনে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তাদের বিশৃঙ্খল কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে মুসলমানগণ উত্তর মেসােপটেমিয়া আর্মেনিয়া ও এশিয়া মাইনরে রােমান শক্তির কেন্দ্র সাইলিসিয়া অধিকার করেন। এরূপে মাত্র ছয় বছরের মধ্যে (৬৩৪-৬৪০ খ্রিঃ) সমগ্র সিরিয়া ও প্যালেস্টাইন মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। খলিফা হযরত ওমর (রা) ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে হযরত মুয়াবিয়াকে সিরিয়ার গভর্নর পদে নিযুক্ত করেন।


রােমানদের সাথে যুদ্ধের কারণ

রাজনৈতিক

হযরত মুহাম্মদ (স) তাঁর জীবদ্দশাই রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট ইসলাম গ্রহণের আহবান জানিয়ে দূত প্রেরণ করেছিলেন। রােমান সম্রাট তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। কিন্তু ব্যক্তিগত অসুবিধা জন্য তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন নি। অনুরূপভাবে সিরিয়ার বানু গাচ্ছান গােত্রীয় খ্রিষ্টান শাসনকর্তার নিকটও মুসলিম দূত প্রেরিত হয়। কিন্তু সেই দূত সিরিয়া যাবার পথে মুতার খ্রিস্টান দলপতি সােরাহবিল কর্তৃক নির্মমভাবে নিহত হয়। সুরাহবিল এ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক নীতিবােধ সম্পূর্ণভাবে বিসর্জন দেয়। এ হত্যাকান্ডের ফলশ্রুতিতে মহানবি (স) এ সময় মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হযরত আবু বকর (রা) এর খিলাফতকালে প্রতিহিংসা নিবারণার্থে সিরিয়া সীমান্তে হযরত উসামা (রা) এর নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয়। উপরন্তু রিদ্দা যুদ্ধের সময় খ্রিস্টান মহিলা ভণ্ড নবি সাজাহকে সাহায্য করায় মুসলমানদের সাথে বাইজান্টাইনদের সম্পর্ক তিক্ততায় পর্যবসিত হয়। সুতরাং উভয় শক্তির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আসন্ন হয়ে ওঠে। বস্তুতপক্ষে রাজনৈতিক দিক দিয়ে ইসলামের নিরাপত্তা এবং ইসলামি সাম্রাজ্য সুদৃঢ়ীকরণের জন্য রােমান সাম্রাজ্যর মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্তি হওয়াই একান্ত বিধেয় ছিল এবং পরবর্তীকালে বাস্তবিকই এর প্রয়ােজনীয়তা পরিলক্ষিত হয়।


অর্থনৈতিক

বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ভূমির উর্বরতা, ঐশ্বর্য ও বৈভব প্রাচীনকাল অনুর্বর আরব ভূখন্ডের অধিবাসীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আরবদের সঙ্গে এ সকল অঞ্চলের বাণিজ্যিক লেনদেনও দীর্ঘকালের। কালক্রমে রােমানদের সাথে মুলমানদের বিরােধ দেখা দিলে তারা বাণিজ্যিক কার্যকলাপে অন্তরায় সৃষ্টি করে। তাই নিজেদের স্বার্থে মুসলমানদের পক্ষে রােমান বিজয় অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বলতে গেলে অর্থনৈতিক কারণেই আরবগণকে রােমান সাম্রাজ্য আক্রমণ করতে বাধ্য করে এবং এ আক্রমণের ফলে আরবদের সাথে বাইজান্টাইনগণের সংঘর্ষ বাধে। পরিণামে এ সংঘর্ষ বৃহদাকার সংগ্রামে পরিণত হয়।


ভৌগােলিক 

ভৌগােলিক দিক দিয়ে সিরিয়ার এবং প্যালেস্টাইন প্রকৃতপক্ষে আরবের অন্তর্গত। এই দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতিসমূহ বৃহত্তর আরব জাতিরই একাংশ। সীমান্তে বসবাসকারী আরবীয় গােত্ৰসমূহ হযরত মুহাম্মদ (স) এর ইন্তিকালের পর আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ আরববাসীদেরকে ইসলাম ত্যাগ করতে যথাসাধ্য প্ররােচিত করত এবং প্রায়ই মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে আক্রমণ চালাত। বাইজান্টাইন সম্রাট এ সমস্ত আক্রমণকারীদের পক্ষ সমর্থন করতেন। সীমান্ত সংঘর্ষ প্রতিহত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বকে বিপদমুক্ত ও সুদৃঢ় করার জন্যই মুসলমানদেরকে রােমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে হয় ।


সামরিক

সামরিক দিক দিয়ে কিলিসমা বর্তমান সুয়েজ শহর রােমানদের নৌ ঘাঁটি ছিল। কিলিসমা হেজাজ প্রদেশের অতি সন্নিকটে অবস্থিত বিধায় শত্রুগণকে হেজাজের এত নিকটে অবস্থান করতে দেওয়া যেতে পারে না। কারণ এতে মুসলমানদের সমূহ বিপদ দেখা দিতে পারে। তাই কিলিসমা হতে শত্রু বিতাড়ন করে নিজেদের অবস্থা সুরক্ষিত করতে মুসলমানগণের পক্ষে মিসর অধিকার অত্যন্ত প্রয়ােজনীয় হয়ে দেখা দিল।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.